যেভাবে আল্লাহর আযাবে ধ্বংস হয়েছিলো আহলে মাদইয়ান

আল্লাহর গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রধান ৬ টি প্রাচীন জাতির মধ্যে পঞ্চম জাতি হল আহলে মাদইয়ান। মাদয়ানবাসীরা ছিল আরব জাতির অন্তর্ভুক্ত। মাদইয়ান শহরে তারা বসবাস করত। মাদইয়ান সিরিয়ার নিকটবর্তী ও হিজাযের সীমান্তবর্তী মা’আন এলাকার একটি গ্রামের নাম। এর অবস্থান হিজাযের পার্শ্বে ও লূত সম্প্রদায়ের হ্রদের সন্নিকটে যা বর্তমানে পূর্ব জর্ডানের সামুদ্রিক বন্দর ’মা’আন’ এর অদূরে বিদ্যমান রয়েছে।

আহলে মাদইয়ান-কে পবিত্র কুরআনে কোথাও কোথাও ’আছহাবুল আইকাহ’ বলা হয়েছে। যার অর্থ জঙ্গলের বাসিন্দাগণ। এটা বলার কারণ এই অবাধ্য জনগােষ্ঠী প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ট হয়ে নিজেদের বসতি ছেড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিলে আল্লাহ তাদেরকে সেখানেই ধ্বংস করে দেন। আবার এটাও বলা হয় যে, উক্ত জঙ্গলে ’আইকা’ বলে একটা গাছকে তারা পূজা করত, যার আশপাশে জঙ্গল বেষ্টিত ছিল। মাদইয়ান যার নামে আহলে মাদইয়ান, তিনি ছিলেন হাজেরা ও সারাহ এর মৃত্যুর পরে হযরত ইবরাহীমের আরব বংশােদ্ভূত কেন’আনী স্ত্রী ক্বানতুরা বিনতে ইয়াক্বত্বিন। লূত (আঃ) এর সম্প্রদায়ের পরেই এই সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়।

মাদইয়ানবাসীরা ছিল মাদইয়ান ইবন মাদইয়ানে ইবন ইবরাহীম (আঃ) এর সন্তান। শোয়াইব ইবন মীকীল ইবন ইয়াশজান তাদের নবী। তবে শোয়াইব (আ)-এর বংশধারা নিয়ে বিভিন্ন মত দেখতে পাওয়া যায়। কেউ বলেন, শোয়াইব ইবনে আশখার ইব্নে লাবায় ইবনে ইয়াকূব। কেউ বলেছেন, শোয়াইব ইবনে নুওয়ায়ব ইব্নে আয়ফা ইবনে মাদইয়ান ইব্নে ইবরাহীম। কারও মতে, শু‘আয়ব ইব্নে দায়ফুর ইবনে আয়ফা ইব্নে ছাবিত ইবনে মাদয়ান ইব্নে ইবরাহীম। এছাড়া আরও বিভিন্ন মত রয়েছে। শোয়াইব (আঃ) হযরত মূসা (আঃ)-এর শ্বশুর ছিলেন। কওমে লূত-এর ধ্বংসের কিছুকাল পরে কওমে মাদইয়ানের প্রতি তিনি প্রেরিত হন।

শোয়াইব (আঃ) একটি সসম্ভ্রান্ত গােত্রের মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। নবুয়তের সম্পদ ছাড়াও তিনি দুনিয়াবী সম্পদে সমৃদ্ধিশালী ছিলেন। বস্তুতঃ সকল নবী-ই স্ব স্ব যুগের সম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তারা উচ্চ মর্যাদাশীল ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর চমৎকার বাগ্মিতার কারণে তিনি ‘খাত্বীবুল আম্বিয়া’ (নবীগণের মধ্যে সেরা বাগ্মী) নামে খ্যাত ছিলেন। হযরত শোয়াইব (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ১০ টি সূরায় ৫৩ টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে!!!

ধ্বংসপ্রাপ্ত বিগত কওমগুলাের বড় বড় কিছু অন্যায় কর্ম ছিল। যার জন্য বিশেষভাবে সেখানে নবী প্রেরিত হয়েছিলেন। শোয়াইব -এর কওমেরও তেমনি মারাত্মক কয়েকটি অন্যায় কর্ম ছিল, যে জন্য তাদের মধ্য থেকে তাদের নিকটে শোয়াইব  (আঃ)-কে প্রেরণ করা হয়।

মাদইয়ানবাসীদের সামাজিক অবস্থা

মাদইয়ানবাসীরা আল্লাহর হক ও বান্দার হক দু’টিই নষ্ট করেছিল। আল্লাহর হক হিসাবে তারা বিশ্বাসের জগতে আল্লাহকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির পূজায় লিপ্ত হয়েছিল কিংবা আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে শরীক করেছিল। তারা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দিয়েছিল। দুনিয়াবী ধনৈশ্বর্যে ও বিলাসে ডুবে গিয়ে তারা আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী এবং তাঁর হক সম্পর্কে গাফেল হয়ে গিয়েছিল। সেই সাথে নিজেদের পাপ মুক্তির জন্য বিভিন্ন সৃষ্ট বস্তুকে শরীক সাব্যস্ত করে তাদের উসীলায় মুক্তি কামনা করত। এভাবে তারা আল্লাহ ও তাঁর গযবের ব্যাপারে গাফেল হয়ে গিয়েছিল।

তারা মাপ ও ওযনে কম দিয়ে বান্দার হক নষ্ট করত। সে সমাজে মানীর মান ছিল না বা গুণীর কদর ছিল না। মাদইয়ান বাসীদের আরেকটি মারাত্মক দোষ ছিলো তারা রাস্তার মােড়ে চৌকি বসিয়ে লােকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করত ও লুটপাট করত। সাথে সাথে তারা লােকদেরকে শোয়াইব  (আঃ) এর উপরে ঈমান আনতে নিষেধ করত ও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করত। তারা সর্বদা আল্লাহর পথে ভুলের সন্ধান করত এবং কোথাও আঙ্গুল রাখার জায়গা পেলে আপত্তি ও সন্দেহের ঝড় তুলে মানুষকে সত্য ধর্ম হতে বিমুখ করার চেষ্টায় থাকত। মাদইয়ানবাসীদের আরেকটি দুষ্কর্ম ছিল যে, তারা প্রচলিত স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার পার্শ্ব হতে সােনা ও রূপার কিছু অংশ কেটে রেখে সেগুলাে বাজারে চালিয়ে দিত। শোয়াইব (আঃ) তাদেরকে এমন কাজ থেকে নিষেধ করেন। তাদের অকৃতজ্ঞতার বিষয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে যে,’স্মরণ কর তােমরা যখন সংখ্যায় কম ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তােমাদের বংশবৃদ্ধি করে তােমাদেরকে একটি বিরাট জাতিতে পরিণত করেছেন। তােমরা ধন-সম্পদে হীন ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তােমাদের প্রাচুর্য দিয়েছেন।’

তারা বলত যে, ঈমানদারগণ যদি ভাল ও সৎ হয়, আর আমরা কাফিররা যদি মন্দ ও পাপী হই, তাহলে আমাদের উভয় দলের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা একরূপ কেন? কাফিররা অপরাধী হলে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের শাস্তি দিতেন। এর উত্তরে নবী বলেন, ‘অপেক্ষা কর যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মাঝে ফায়ছালা করেন বস্তুতঃ তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী।’

দাওয়াত

হযরত শোয়াইব (আঃ) তাঁর জাতিকে এইসব ঘৃনিত কাজ ছেড়ে দেয়ার জন্য সবসময় দাওয়াত দিতেন। তাঁর নিঃস্বার্থ ও আন্তরিকতাপূর্ণ দাওয়াত তাঁর উদ্ধত কওমের নেতাদের হৃদয়ে রেখাপাত করল না। তারা বরং আরও উদ্ধত হয়ে তাঁর দরদ ভরা সুললিত বয়ান ও অপূর্ব চিত্তহারী বাগ্মীতার জবাবে পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত কওমের পাপিষ্ঠ নেতাদের ন্যায় নবীকে প্রত্যাখ্যান করল এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও তাচ্ছিল্য করে বলল, ‘ছালাত কি তােমাকে একথা শিখায় যে, আমরা আমাদের ঐসব উপাস্যের পূজা ছেড়ে দিই, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যুগ যুগ ধরে যে সবের পূজা করে আসছে? আর আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত আমরা যা কিছু করে থাকি, তা পরিত্যাগ করি ? তুমি তাে একজন সহনশীল ও সৎ ব্যক্তি। অথচ তুমি একজন জ্ঞানী, দূরদর্শী ও সাধু ব্যক্তি হয়ে একথা কিভাবে বলতে পার যে, আমরা আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা দেব-দেবীর পূজা ও বিভিন্ন প্রথা সমূহ পরিত্যাগ করি এবং আমাদের আয়-উপাদানে ও রূযী রােজগারে ইচ্ছামত চলা ছেড়ে দেই। আয়-ব্যয়ে কোনটা হালাল কোনটা হারাম তা তােমার কাছ থেকে জেনে নিয়ে কাজ করতে হবে এটা কি কখনাে সম্ভব হতে পারে?’- তাদের ধারণা মতে তাদের সকল কাজ চোখ বুজে সমর্থন করা ও তাতে বরকতের জন্য দোয়া করাই হল সৎ ও ভাল মানুষদের কাজ। ঐসব কাজে শিরক ও তাওহীদ, হারাম ও হালালের প্রশ্ন তােলা কোন ধার্মিক ব্যক্তির কাজ হতে পারে না!

দ্বিতীয়ত: তারা ইবাদাত ও মু’আমালাতকে পরস্পরের প্রভাবমুক্ত ভেবেছিল। ইবাদত কবুলের জন্য যে রূযী হালাল হওয়া জরুরি, একথা তাদের বুঝে আসেনি। সেজন্য তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে হালাল-হারামের বিধান মানতে রাযী ছিল না। যদিও ছালাত আদায়ে কোন আপত্তি তাদের ছিল না। কেননা দেব-দেবীর পূজা সত্ত্বেও সৃষ্টিকর্তা হিসাবে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও স্বীকৃতি সবারই ছিল। তাদের আপত্তি ছিল কেবল একটি ব্যাপারে যে, সবকিছু ছেড়ে কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে হবে এবং দুনিয়াবী ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হবে। তারা ধর্মকে কতিপয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমিত মনে করত এবং ব্যবহারিক জীবনে তার কোন দখল দিতে প্রস্তুত ছিল না। শোয়াইব  (আঃ) অধিকাংশ সময় ছালাত ও ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন বলে তাকে বিদ্রুপ করে কোন কোন নেতা এরূপ কথাও বলে ফেলে যে, ‘তােমার ছালাত কি তােমাকে এসব আবােল তাবােল কথা-বার্তা শিক্ষা দিচ্ছে?’ কওমের লােকদের এসব বিদ্রুপবান ও রূঢ় মন্তব্য সমূহে বিচলিত না হয়ে অতীব ধৈর্য ও দরদের সাথে তিনি তাদের সম্বােধন করে বললেন, ‘হে আমার জাতি! তােমরা কি মনে কর আমি যদি আমার পালনকর্তার পক্ষ হতে সুস্পষ্ট দলীলের উপরে কায়েম থাকি, আর তিনি যদি নিজের তরফ থেকে আমাকে (দ্বীনী ও দুনিয়াবী) উত্তম রিযিক দান করে থাকেন, (তবে আমি কি তাঁর হুকুম অমান্য করতে পারি?)। আর আমি চাই না যে, আমি তােমাদেরকে যে বিষয়ে নিষেধ করি, পরে নিজেই সে কাজে লিপ্ত হই। আমি আমার সাধ্যমত তােমাদের সংশােধন চাই মাত্র। আর আমার কোনই ক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত। আমি তার উপরেই নির্ভর করি এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাই।’

‘হে আমার জাতি! আমার প্রতি হঠকারিতা করে তােমরা নিজেদের উপরে নূহ, হূদ বা ছালেহ-এর কওমের মত আযাব ডেকে এনাে না। আর লুতের কওমের ঘটনা তাে তােমাদের থেকে দূরে নয়।’ তােমরা তােমাদের প্রভুর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তাঁর দিকেই ফিরে এসো। নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা অতীব দয়ালু ও প্রেমময়।’

তারা বলল, ‘হে শোয়াইব! তােমার এসব কথা আমরা বুঝি না। তােমাকে তাে আমাদের মধ্যকার একজন দুর্বল ব্যক্তি বলে আমরা মনে করি। যদি তােমার জাতি-গােষ্ঠীর লােকেরা না থাকত, তাহলে এতদিন আমরা তােমাকে পাথর মেরে চূর্ণ করে ফেলতাম। তুমি আমাদের উপরে মােটেই প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি নও।’ শোয়াইব (আঃ) বললেন, ‘হে আমার কওম! আমার জ্ঞাতি-গােষ্ঠী কি তােমাদের নিকটে আল্লাহর চেয়ে অধিক ক্ষমতাশালী? অথচ তােমরা তাঁকে পরিত্যাগ করে পিছনে ফেলে রেখেছ? মনে রেখ তােমাদের সকল কার্যকলাপ আমার পালনকর্তার আয়ত্তাধীন। অতএব হে আমার জাতি! তােমরা তােমাদের স্থানে কাজ কর, আমিও কাজ করে যাই। অচিরেই তােমরা জানতে পারবে কার উপরে আযাব নেমে আসে, আর কে মিথ্যাবাদী। তােমরা অপেক্ষায় থাক, আমিও অপেক্ষায় রইলাম।’ জবাবে তাদের দাম্ভিক নেতারা চূড়ান্তভাবে বলে দিল, ‘আমরা অবশ্যই তােমাকে ও তােমার সাথী ঈমানদারগণকে শহর থেকে বের করে দেব অথবা তােমরা আমাদের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে।’ তারা আরও বলল ‘নিঃসন্দেহে তুমি জাদুগ্রস্তদের অন্যতম। তুমি আমাদের মত একজন মানুষ বৈ কিছুই নও। আমাদের ধারণা তুমি অবশ্যই মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবে আকাশের কোন টুকরা আমাদের উপরে ফেলে দাও।’

শোয়াইব (আঃ) তখন নিরাশ হয়ে প্রথমে কওমকে বললেন, ‘আমরা আল্লাহর উপরে মিথ্যারােপকারী হয়ে যাব যদি আমরা তােমাদের ধর্মে ফিরে যাই। অথচ আল্লাহ আমাদেরকে তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। ঐ ধর্মে ফিরে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে যদি না আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ সেটা চান। আমাদের পালনকর্তা স্বীয় জ্ঞান দ্বারা প্রত্যেক বস্তুকে বেষ্টন করে আছেন। (অতএব) আল্লাহর উপরেই আমরা ভরসা করলাম।’ অতঃপর তিনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে বললেন, ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের ও আমাদের কওমের মধ্যে তুমি যথার্থ ফয়সালা করে দাও। আর তুমিই তাে শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী।’ তখন তাঁর কওমের কাফের নেতারা বলল, ‘যদি তােমরা শােয়াইবের অনুসরণ কর, তবে তােমরা নিশ্চিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

শোয়াইব  (আঃ) স্বীয় কওমের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। তিনি তাদের কাছ থেকে প্রস্থান করলেন এবং বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমি তােমাদেরকে আমার প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি এবং তােমাদের উপদেশ দিয়েছি। এখন আমি কাফেরদের জন্য আর কিভাবে সহানুভূতি দেখাব।’

মাদইয়ানবাসীর উপরে আপতিত গযব

হযরত শোয়াইব (আঃ)-এর শত উপদেশ উপেক্ষা করে যখন কওমের নেতারা তাদের অন্যায় কর্মসমূহ চালিয়ে যাবার ব্যাপারে অনড় রইল এবং নবীকে জনপদ থেকে বের করে দেবার ও হত্যা করার হুমকি দিল ও সর্বোপরি হঠকারিতা করে তারা আল্লাহর গযব প্রত্যক্ষ করতে চাইল, তখন তিনি বিষয়টি আল্লাহর উপরে সােপর্দ করলেন এবং কওমের নেতাদের বললেন ঠিক আছে, ‘তােমরা এখন আযাবের অপেক্ষায় থাক। আমিও তােমাদের সাথে অপেক্ষায় রইলাম।’ বলা বাহুল্য, আল্লাহ তায়ালা স্বীয় চিরন্তন বিধান অনুযায়ী শোয়াইব  (আঃ) ও তাঁর ঈমানদার সাথীগণকে উক্ত জনপদ হতে অন্যত্র নিরাপদে সরিয়ে নিলেন।

এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, “অতঃপর যখন আমার আদেশ এসে গেল, তখন আমি শোয়াইব ও তার ঈমানদার সাথীদের নিজ অনুগ্রহে রক্ষা করলাম। আর পাপিষ্ঠদের উপর বিকট গর্জন আপতিত হল। ফলে তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে মরে পড়ে রইল। তারা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হল যেন তারা কখনই সেখানে বসবাস করেনি। সাবধান! ছামূদ জাতির উপর অভিসম্পাতের ন্যায় মাদইয়ানবাসীর উপরেও অভিসম্পাত। যদিও তারা দুনিয়াতে মযবুত ও নিরাপদ অট্টালিকায় বসবাস করত।’

মাদইয়ানবাসীর উপরে গযবের ব্যাপারে কুরআনে তিন ধরনের শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যার অর্থ- মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, বিকট আওয়াজ, ভূমিকম্প। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, আহলে মাদইয়ানের উপরে প্রথমে সাতদিন এমন ভীষণ গরম চাপিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা দহন জ্বালায় ছটফট করতে থাকে। অতঃপর আল্লাহ তায়লা একটি ঘন কালাে মেঘমালা পাঠিয়ে দিলেন, যার নীচ দিয়ে শীতল বায়ু প্রবাহিত হচ্ছিল। তখন কওমের লােকেরা ঊর্ধ্বশ্বাসে সেখানে দৌড়ে এল। এভাবে সবাই জমা হবার পর হঠাৎ ভূমিকম্প শুরু হ’ল এবং মেঘমালা হতে শুরু হল অগ্নিবৃষ্টি। তাতে মানুষ সব পােকা-মাকড়ের মত পুড়ে ছাই হতে লাগল। ইবনু আব্বাস (রাঃ) ও মুহাম্মাদ বিন কা’ব আল কুরাযী বলেন, অতঃপর তাদের উপর নেমে আসে এক বজ্রনিনাদ। যাতে সব মরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এভাবে কোনরূপ জোর করা ছাড়াই আল্লাহদ্রোহীরা সবাই পায়ে হেঁটে স্বেচ্ছায় বধ্যভূমিতে উপস্থিত হয় এবং চোখের পলকে সবাই ধ্বংস হয়ে যায়। মক্কা থেকে সিরিয়া যাওয়ার পথে এসব ধ্বংসস্থল নযরে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন এসব স্থান অতিক্রম করতেন, তখন আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে পড়তেন ও সওয়ারীকে দ্রুত হাঁকিয়ে নিয়ে স্থান অতিক্রম করতেন।

ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ বলেন, শোয়াইব (আঃ) ও তাঁর মুমিন সাথীগণ মক্কায় চলে যান ও সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। কা’বা গৃহের পশ্চিম দিকে দারুন নাদওয়া ও দার বনু সাহমের মধ্যবর্তী স্থানে তাদের কবর হয়। তবে এই সকল বর্ণনার ভিত্তি সুনিশ্চিত নয়। আর থাকলেও সেগুলি সবই এখন নিশ্চিহ্ন এবং সবই বায়তুল্লাহ এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *