সামুদ জাতির ধ্বংসের প্রকৃত ইতিহাস…

ছামূদ এক ইতিহাস-প্রসিদ্ধ জাতির নাম। এই জাতি ছিল হযরত ছালেহ (আ)-এর জাতি। তাদের পূর্ব-পুরুষ ছামূদ এর নামানুসারে এ জাতির নামকরণ করা হয়েছে। ছামূদ-এর আর এক ভাই ছিল জুদায়স। তারা উভয়ে আবির ইবনে ইরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ এর পুত্র। আদ জাতির ধ্বংসের প্রায় ৫০০ বছর পরে হযরত ছালেহ (আঃ) কওমে ছামূদ- এর প্রতি নবী হিসাবে প্রেরিত হন। হযরত ছালেহ (আ) হযরত নূহ (আঃ) এর বংশধর। হযরত ছালেহ থেকে নূহ (আঃ) পর্যন্ত বংশ পরম্পরাটি এইরুপ বলে জানা যায়- ছালেহ ইবন আবদ ইবন মাসিহ্ ইবন উবায়দ ইবন হাজির ইবন হামূদ ইবন আবির ইবন ইরাম ইবন সাম ইবন নূহ (আঃ)।

কওমে আদ ও কওমে ছামূদ একই দাদা ইরাম এর দুটি বংশধারার নাম। কওমে ছামূদ আরবের উত্তর পশ্চিম এলাকায় বসবাস করত। এরা ছিল আরবে আরিবা তথা আদি আরব সম্প্রদায়ের লােক। তাদের প্রধান শহরের নাম ছিল ‘হিজর’। হিজায ও তবূকের মধ্যবর্তী ১ টি স্থান হিজর, যা শামদেশ অর্থাৎ সিরিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে একে সাধারণভাবে মাদায়েনে ছালেহ বলা হয়ে থাকে। তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (স) এই পথ দিয়ে অতিক্রম করেছিলেন। আদ জাতির ধ্বংসের পর ছামূদ জাতি তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। তারাও আদ জাতির মত শক্তিশালী ও বীরের জাতি ছিল। তারা পাথর খােদাই ও স্থাপত্য বিদ্যায় খুবই পারদর্শী ছিল। সমতল ভূমিতে বিশালকায় অট্টালিকা নির্মাণ ছাড়াও পর্বতগাত্র খােদাই করে তারা নানা রূপ প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করত। তাদের স্থাপত্যের নিদর্শনাবলী আজও বিদ্যমান রয়েছে। এগুলাের গায়ে ইরামী ও ছামূদী বর্ণমালার শিলালিপি খােদিত রয়েছে। অভিশপ্ত অঞ্চল হওয়ার কারণে এলাকাটি আজও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। কেউ সেখানে বসবাস করে না। ৯ম হিজরীতে তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার পথে মুসলিম বাহিনী হিজরে অবতরণ করলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে সেখানে প্রবেশ করতে নিষেধ করেন।

অর্থবিত্ত আর শক্তিমত্তার কারনে ছামূদ জাতি নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করতো। এরই মাঝে তারা নানা পাপাচারে লিপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। অথচ কওমে নূহের কঠিন শাস্তির ঘটনাবলী তখনও লােকমুখে আলােচিত হত। আর কওমে আদ- এর নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঘটনা তাে তাদের কাছে একপ্রকার টাটকা ঘটনাই ছিল। অথচ তাদের ভাইদের ধ্বংসস্তুপের উপরে বড় বড় বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণ করে ও বিত্ত বৈভবের মালিক হয়ে তারা পিছনের কথা ভুলে গেল। এমনকি তারা আদ জাতির মত অহংকারী কার্যকলাপ শুরু করে দিল। তারা শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত হল। এমতাবস্থায় তাদের হেদায়াতের জন্য তাদেরই বংশের মধ্য হতে ছালেহ (আঃ) কে আল্লাহ নবী মনােনীত করে পাঠালেন। তিনি তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত করতে, তার সাথে কাউকে শরীক না করতে এবং মূর্তিপূজা ও শিরক বর্জনের নির্দেশ দেন। ফলে কিছু সংখ্যক লােক তাঁর প্রতি ঈমান আনে। কিন্তু অধিকাংশ লােকই কুফরীতে লিপ্ত থাকে এবং কথায়-কাজে তাঁকে কষ্ট দেয়। এমনকি এক পর্যায়ে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়।

পথভােলা জাতিকে হযরত ছালেহ (আঃ) সর্বপ্রথম তাওহীদের দাওয়াত দিলেন। তিনি তাদেরকে মূর্তিপূজাসহ যাবতীয় শিরক ও কুসংস্কার ত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর প্রেরিত বিধান সমূহের প্রতি আনুগত্যের আহ্বান জানালেন। তিনি যৌবনকালে নবুয়তপ্রাপ্ত হন। তখন থেকে বার্ধক্যকাল অবধি তিনি স্বীয় কওমকে নিরন্তর দাওয়াত দিতে থাকেন। ঠিক কত বছর দাওয়াত দেন এ সম্পর্কে জানা যায় নি। তবে তিনি প্রায় ১৮০ বছর হায়াত পান বলে জানা যায়। সেই হিসেবে ১টা অনুমান করা যায় তিনি কত বছর তাঁর কওমকে দাওয়াত দেন। কওমের দুর্বল শ্রেণীর লােকেরা তাঁর উপরে ঈমান আনলেও শক্তিশালী ও নেতৃস্থানীয় লােকেরা তাঁকে অস্বীকার করে।

হযরত ছালেহ (আঃ) এর দাওয়াতের মূল বক্তব্য ছিলো এইরুপ- তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের আহবান করে বলতেন, ”হে আমার সম্প্রদায়! তােমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তােমাদের অন্য কোন ইলাহ নেই। স্মরণ কর, আদ জাতির পর তিনি তােমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন, তিনি তােমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, তােমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ ও পাহাড় কেটে বাস-গৃহ নির্মাণ করছ। সুতরাং আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটিয়াে না। তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানরা সেই সম্প্রদায়ের ঈমানদার যাদের দুর্বল মনে করা হত। তাদের বলল, তােমরা কি জান যে, ছালেহ আল্লাহু কর্তৃক প্রেরিত? তারা বলল, ”তার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাসী। দাম্ভিকেরা বলল, তােমরা যা বিশ্বাস কর আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি। ইতিপূর্বেকার ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলির ন্যায় কওমে ছামূদও তাদের নবী হযরত ছালেহ (আঃ)-কে অমান্য করে। তারা বিগত আদ জাতির ন্যায় পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে থাকে। নবী তাদেরকে যতই দাওয়াত দিতে থাকেন, তাদের অবাধ্যতা ততই সীমা লংঘন করতে থাকে। তারা বলল, হে ছালেহ ! ইতিপূর্বে আপনি আমাদের কাছে আকাংখিত ব্যক্তি ছিলেন। আপনি কি বাপ- দাদার আমল থেকে চলে আসা উপাস্যদের পূজা করা থেকে আমাদের নিষেধ করছেন? অথচ আমরা আপনার দাওয়াতের বিষয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। এছাড়া তারা নবীকে মিথ্যাবাদী বলেও আখ্যা দিলো।

হযরত ছালেহ (আঃ) এর নিরন্তর দাওয়াতে অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রদায়ের নেতারা স্থির করল যে, তাঁর কাছে এমন একটা বিষয় দাবী করতে হবে, যা পূরণ করতে তিনি ব্যর্থ হবেন এবং মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হবেন, এর ফলে তার দাওয়াতও বন্ধ হয়ে যাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা এসে তাঁর নিকটে দাবী করল যে, আপনি যদি আল্লাহর সত্যিকারের নবী হন, তাহলে আমাদেরকে নিকটবর্তী ‘কাতেবা’ পাহাড়ের ভিতর থেকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী সবল ও স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্ৰী বের করে এনে দেখান। দাবী শুনে হযরত ছালেহ (আঃ) তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলেন যে, যদি তােমাদের দাবী পুরণ করা হয়, তবে তােমরা আমার নবুয়তের প্রতি ও আমার দাওয়াতের প্রতি ঈমান আনবে কি?-জেনে রেখ, উক্ত মু’জেযা প্রদর্শনের পরেও যদি তােমরা ঈমান না আনাে, তাহলে আল্লাহর গযবে তােমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। এতে সবাই স্বীকৃত হ’ল ও উক্ত মর্মে অঙ্গীকার করল। তখন ছালেহ (আঃ) নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ পাক তার দোয়া কবুল করলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ের গায়ে কম্পন দেখা দিল এবং একটি বিরাট প্রস্তর খণ্ড বিস্ফোরিত হয়ে তার ভিতর থেকে কওমের নেতাদের দাবীর অনুরূপ একটি গর্ভবতী ও লাবণ্যবতী তরতাযা উষ্ট্ৰী বেরিয়ে এল। ছালেহ (আঃ) এর এই বিস্ময়কর মু’জেযা দেখে গােত্রের নেতা সহ তার সমর্থক লােকেরা সাথে সাথে মুসলমান হয়ে গেল। যারা ঈমান এনেছিল তাদের প্রধান ছিল জানদা ইবন আমর ইবন মুহাব্বত ইবন লবীদ ইবন জুওয়াস। এ ছিল ছামূদ সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা। সম্প্রদায়ের অবশিষ্ট শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী হয়, কিন্তু তিন ব্যক্তি তাদেরকে তা থেকে বিরত রাখে। তারা হল, যাওয়াব ইবন উমর ইবন লবীদ ও খাব্বাব। এ দুইজন ছিল তাদের ধর্মগুরু এবং অপরজন রাবাব ইবন সামআর ইন জার্মাস। জানদা ইসলাম গ্রহণ করার পর আপন চাচাত ভাই শিহাব ইবন খলীফাকে ঈমান আনার জন্যে আহ্বান জানায়। সেও ছিল সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় লোক এবং ইসলাম গ্রহণ করার জন্যে সেও উদ্যত হয়। কিন্তু ঐ ব্যক্তিরা তাকে বাধা দিলে সে তাদের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। অবশিষ্ট আরও অনেকেই মুসলমান হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল। কিন্তু প্রধান ধর্মনেতা ও অন্যান্য সমাজ নেতাদের বাধার কারণে হতে পারল না। তারা উল্টা বলল, আমরা তােমাকে ও তােমার সাথে যারা আছে তাদেরকে অকল্যাণের প্রতীক মনে করি। হযরত ছালেহ (আঃ) কওমের নেতাদের এভাবে অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে দেখে এবং পাল্টা তাকেই দায়ী করতে দেখে দারুণভাবে শংকিত হলেন যে, যেকোন সময়ে এরা আল্লাহর গযবে ধ্বংস হয়ে যাবে।

তিনি তাদেরকে সাবধান করে বললেন, দেখ, তােমাদের মঙ্গলামঙ্গল আল্লাহর নিকটে রয়েছে। বরং তােমরা এমন সম্প্রদায়, যাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। অতঃপর পয়গম্বরসূলভ দয়া প্রকাশ করে বললেন এটি আল্লাহর উষ্ট্ৰী। তােমাদের জন্য নিদর্শন স্বরূপ। একে আল্লাহর যমীনে স্বাধীনভাবে চরে বেড়াতে দিবে । সাবধান! একে অসৎ উদ্দেশ্যে স্পর্শ করাে না।

সেই উটনী যখন কূয়ার পানি পান করতো সেদিন অন্য গবাদি পশুরা পানি পেত না, এর জন্য আল্লাহর নির্দেশে হযরত সালেহ (আঃ) পানি বণ্টন করে দিয়েছিলেন এভাবে যে, একদিন উষ্ট্রীর ও পরের দিন তােমাদের পানি পানের জন্য পালা। এটা আল্লাহ নির্ধারিত করেছিলেন।। বস্তুত এটা ছিলো তাদের জন্য সর্বশেষ পরীক্ষা। ছামূদ জাতির লােকেরা যে কূপ থেকে পানি পান করত ও তাদের গবাদি পশুদের পানি পান করাত, এ উষ্ট্রীও সেই কূপ থেকে পানি পান করত। উষ্ট্রী যেদিন পানি পান করত, সেদিন কূয়ার পানি নিঃশেষে পান করে ফেলত। অবশ্য ঐদিন লােকেরা উষ্ট্রীর দুধ পান করত এবং এ পরিমাণ দুধ পাওয়া যেত যে বাকী দুধ দ্বারা তাদের সব পাত্র ভরে নিত। অন্যদিন তারা কূয়ার পানি ব্যবহার করত এবং পরের দিনের জন্য পানি সংগ্রহ করে রাখতো। কিন্তু এই হতভাগাদের কপালে এত সুখ সহ্য হল না। তারা একদিন পানি না পাওয়াকে অসুবিধার কারণ হিসাবে গণ্য করল। তাছাড়া উষ্ট্রী যখন ময়দানে চরে বেড়াত, তখন তার বিশাল দেহ ও অপরূপ চেহারা দেখে অন্যান্য গবাদি পশু ভয় পেত। ফলে তারা উষ্ট্রীকে মেরে ফেলতে মনস্থ করল। কিন্তু আল্লাহর গযবের ভয়ে কেউ সাহস করল না।

দীর্ঘ দিন যাবত এ অবস্থা চলতে থাকায় সম্প্রদায়ের লােকেরা অধৈর্য হয়ে পড়ে। এর থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্যে তারা একদা সমবেত হয় ও পরামর্শ করে। তারা সম্মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্ত করে যে, উটনীটিকে হত্যা করতে হবে। এর ফলে তারা উটনীটির কবল থেকে নিষ্কৃতি পাবে এবং সমস্ত পানির উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব তাদের প্রতিষ্ঠিত হবে। শয়তান তাদেরকে এ কাজের যুক্তি ও সুফল প্রদর্শন করল। যে লােক উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে তার নাম কিদার ইন সালিফ ইবন জানদা- সে ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা। সে ছিল গৌরবর্ণ, নীল চোখ ও পিঙ্গল চুল বিশিষ্ট। কথিত, সে ছিল সালিফ-এর যারজ সন্তান। কিদার হত্যা করলেও যেহেতু সম্প্রদায়ের সকলের ঐক্যমত করেছিল তাই হত্যা করার দায়িত্ব সবার প্রতি আরােপিত হয়েছে।

ইবনে জারীর (র) প্রমুখ মুফাসসির লিখেছেন- ছামূদ সম্প্রদায়ের দুই মহিলা-একজনের নাম সাদূক। সে মাহুয়া ইবন যুহায়র ইবন মুখতারের কন্যা এবং প্রচুর ধন-সম্পদ ও বংশীয় গৌরবের অধিকারী। তার স্বামী ইসলাম গ্রহণ করে। ফলে স্ত্রী তাকে ত্যাগ করে এবং নিজের চাচাত ভাই মিসরা ইবনে মিহরাজ ইবনে মাহুয়াকে বলে, যদি তুমি উটনীটি হত্যা করতে পার, তবে তােমাকে আমি বিয়ে করব। অপর মহিলাটি ছিল উনায়যা বিনত নায়ম ইবনে মিজলায, তাকে উন্মে উছমান বলে ডাকা হতাে। মহিলাটি ছিল বৃদ্ধা এবং কাফির। তার স্বামী ছিল সম্প্রদায়ের অন্যতম সর্দার যুওয়াব ইন অমর। এই স্বামীর ঔরসে তার চারটি কন্যা ছিল। মহিলাটি কিদার ইবন সালিফকে প্রস্তাব দেয় যে, সে যদি উটনীটি হত্যা করতে পারে তবে তার এ চার কন্যার মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারবে। তখন ঐ যুবকদ্বয় উটনী হত্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং সম্প্রদায়ের লােকদের সমর্থন লাভের চেষ্টা চালায়। সে মতে, অপর সাত ব্যক্তি তাদের ডাকে সাড়া দেয়। এভাবে তারা নয়জন ঐক্যবদ্ধ হয়। কুরআনে সে কথাই বলা হয়েছে- “আর সেই শহরে ছিল এমন ৯ ব্যক্তি যারা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং কোন সৎকর্ম করত না”। তারপর এই ৯ জন তাদের সম্প্রদায়ের কাছে যায় এবং উটনী হত্যার উদ্যোগের কথা জানায়। এ ব্যাপারে সকলেই তাদেরকে সমর্থন করে ও সহযােগিতার আশ্বাস দেয়। এরপর তারা উটনীর সন্ধানে বের হয়। যখন তারা দেখতে পেল যে, উটনীটি পানির ঘাট থেকে ফিরে আসছে, তখন তাদের মধ্যকার মিসরা নামক ব্যক্তিটি যে পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে বসে ছিল, সে একটি তীর তার দিকে ছুঁড়ে মারে। তীরটি উটনীটির পায়ের গােছা ভেদ করে চলে যায়। এদিকে মহিলারা গােটা গোত্রের মধ্যে উটনী হত্যার কথা ছড়িয়ে তাদেরকে উৎসাহিত করতে থাকে। কিদার ইবন সালিফ অগ্রসর হয়ে তলােয়ার দিয়ে আঘাত করে উটনীটির পায়ের গােছার রগ কেটে দেয়। সাথে সাথে উটনীটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং বিকট শব্দে চিৎকার দিয়ে ওঠে। চিৎকারের মাধ্যমে সে তার বাচ্চাকে সতর্ক করে। কিদার পুনরায় বর্শা দিয়ে উটনীটির বুকে আঘাত করে এবং তাকে হত্যা করে। ওদিকে বাচ্চাটি একটি দুর্গম পাহাড়ে আরােহণ করে তিনবার ডাক দেয়।

আবদুর রজ্জাক (র), হাসান (র) থেকে বর্ণিত- উটনীটির বাচ্চার ডাক ছিল এই, হে আমার রব! আমার মা কোথায়? এরপর একটি পাথরের মধ্যে প্রবেশ করে অদৃশ্য হয়ে যায়। কারাে কারাে মতে, লােকজন ঐ বাচ্চার পশ্চাদ্ধাবন করে তাকেও হত্যা করেছিল।

উষ্ট্রী হত্যার ঘটনার পর ছালেহ (আঃ) স্বীয় কওমকে আল্লাহর নির্দেশ জানিয়ে দিলেন যে, এখন থেকে তিনদিন তােমরা তােমাদের ঘরে আরাম করে নাও। এ ওয়াদার (অর্থাৎ এ সময়সীমার) কোন ব্যতিক্রম হবে না। কিন্তু এই তারা এতই অহংকারী ও নির্ভয় হয়ে গিয়েছিলো যে, এরূপ কঠোর হুঁশিয়ারির কোন গুরুত্ব না দিয়ে বরং তাচ্ছিল্যভরে বলল,  হে ছালেহ ! তুমি যার ভয় দেখাচ্ছ, তা নিয়ে আস দেখি, যদি তুমি সত্যিকারের নবী হয়ে থাক। তারা ব্যাপারটা খুব হাসি ঠাট্টাভাবেই নিয়েছিলো। তারা বলল, আমরা জানতে চাই, এ শাস্তি কিভাবে আসবে, কোথেকে আসবে, এর লক্ষণ কি হবে ? ছালেহ (আঃ) বললেন, আগামীকাল বৃহস্পতিবার তােমাদের সকলের মুখমণ্ডল হলুদ হয়ে যাবে। পরের দিন শুক্রবার তােমাদের সবার মুখমণ্ডল লালবর্ণ ধারণ করবে। অতঃপর শনিবার দিন সবার মুখমণ্ডল ঘাের কৃষ্ণবর্ণ হয়ে যাবে। এটাই হবে তােমাদের জীবনের শেষ দিন। একথা শােনার পরও তাদের হুশ ফিরে নি, অথচ তাদের সামনেই উটনী মু’জিজা দেখিয়েছিলেন হযরত সালেহ (আঃ)। দূর্ভাগা সেই জাতি আল্লাহর নিকটে তওবা করে ক্ষমা প্রার্থনার পরিবর্তে স্বয়ং ছালেহ (আঃ)-কেই হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ভাবল, যদি আযাব এসেই যায়, তবে তার আগে একেই শেষ করে দিই। কেননা এর নবুয়তকে অস্বীকার করার কারণেই গযব আসছে। অতএব এই ব্যক্তিই গযবের জন্য প্রধান দায়ী। আর যদি গযব না আসে, তাহলে সেটি হবে তার মিথ্যার দণ্ড। কওমের সেই নয়জন নেতা এ নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দেয়। উল্লেখ্য যে, কুরআনে ঐ নয় ব্যক্তিকে নয়টি দল বলা হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে, ওরা নয়জন নয়টি দলের নেতা ছিল এবং তারা ছিল হিজর জনপদের প্রধান নেতৃবৃন্দ। তারা বলল, তােমরা পরস্পরে শপথ কর যে, আমরা রাত্রিকালে ছালেহ ও তার পরিবার বর্গকে হত্যা করব। অতঃপর তার রক্তের দাবীদারকে আমরা বলে দেব যে, আমরা এ হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করিনি। আর আমরা নিশ্চিতভাবে সত্যবাদী। তারা যুক্তি দিল, আমরা আমাদের কথায় অবশ্যই সত্যবাদী প্রমাণিত হব। কারণ রাত্রির অন্ধকারে কে কাকে মেরেছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যাবে না। নেতৃবৃন্দের এ সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ও চক্রান্ত অনুযায়ী নয় নেতা তাদের প্রধান কাদার বিন সালেফ- এর নেতৃত্বে রাতের বেলা ছালেহ (আঃ) কে হত্যা করার জন্য তার বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হ’ল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁর নবীকে কিভাবে রক্ষা করবেন তা শুধু তিনিই জানেন। হত্যার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথের মধ্যেই তাদের উপর পাথর বর্ষণ শুরু হয় ও তাতে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।

যাই হােক, নির্ধারিত দিনে গযব নাযিল হওয়ার প্রাক্কালেই আল্লাহর হুকুমে হযরত ছালেহ (আঃ) স্বীয় ঈমানদার সাথীগণকে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। যাওয়ার সময় তিনি স্বীয় কওমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, হে আমার জাতি ! আমি তােমাদের কাছে স্বীয় পালনকর্তার পয়গাম পৌছে দিয়েছি এবং সর্বদা তােমাদের কল্যাণ কামনা করেছি। কিন্তু তােমরা তােমাদের কল্যাণকামীদের ভালবাসাে না।

হযরত ছালেহ (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী বৃহস্পতিবার ভােরে অবিশ্বাসী কওমের সকলের মুখমণ্ডল গভীর হলুদ বর্ণ ধারণ করল। কিন্তু তারা ঈমান আনল না বা তওবা করল না। বরং উল্টা হযরত ছালেহ (আঃ)-এর উপর চটে গেল ও তাঁকে হত্যা করার জন্য খুঁজতে লাগল। দ্বিতীয় দিন সবার মুখমণ্ডল লাল বর্ণ ও তৃতীয় দিন ঘাের কৃষ্ণবর্ণ হয়ে গেল। তখন সবাই নিরাশ হয়ে গযবের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। চতুর্থ দিন রবিবার সকালে তারা সুগন্ধি মেখে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করতে থাকল— কি শাস্তি ও আযাব নাযিল হয় তা দেখার জন্যে। তাদের কোনই ধারণা ছিল না যে, তাদেরকে কি করা হবে এবং কোন দিক থেকে আযাব আসবে। কিছু সময় পর সূর্য যখন উপরে এসে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তখন আসমানের দিক থেকে বিকট আওয়াজ এলাে এবং নিচের দিক থেকে প্রবল ভূকম্পন শুরু হল। সাথে সাথে তাদের প্রাণবায়ু উড়ে গেল, সকল নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল, সবকিছু স্তব্ধ হল এবং যা সত্য তাই বাস্তবে ঘটে গেল। ফলে সবাই লাশ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল। অন্য আয়াতে এসেছে যে, আমরা তাদের প্রতি একটিমাত্র নিনাদ পাঠিয়েছিলাম। তাতেই তারা শুষ্ক খড়কুটোর মত হয়ে গেল। কোন কোন হাদীছে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ছামূদ জাতির উপরে আপতিত গযব থেকে ’আবু রেগাল’ নামক জনৈক অবিশ্বাসী নেতা ঐ সময় মক্কায় থাকার কারণে বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু হারাম শরীফ থেকে বেরােবার সাথে সাথে সেও গযবে পতিত হয়।

আবার কোনো কোনো ইতিহাসবেত্তাগণ লিখেছেন, ছামূদ সম্প্রদায়ের এ আযাব থেকে একজন মাত্র মহিলা ছাড়া আর কেউই মুক্তি পায়নি। মহিলাটির নাম কালবা বিনতে সালাকা, ডাকনাম যারীআ। সে ছিল কট্টর কাফির ও হযরত সালিহ (আ)-এর চরম বিদ্বেষি। আযাব আসতে দেখেই সে দ্রুত বের হয়ে দৌড়ে এক আরব গােত্রে গিয়ে উঠল এবং তার সম্প্রদায়ের উপর পতিত যে আযাব সে প্রত্যক্ষ করে এসেছে- তার বর্ণনা দিল। পিপাসায় কাতর হয়ে সে পানি পান করতে চাইল। কিন্তু পানি পান করার সাথে সাথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।

এভাবেই আল্লাহর নাফরমান ও নবীকে নিয়ে চক্রান্তকারী এক জাতির সমাপ্তি ঘটেছিলো। আল্লাহ আমাদের তাঁর নবীর দেখানো পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন।

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *