মুহাম্মদ যদি আমার উপর থুথুও নিক্ষেপ করতো, তবুও আমি মরে যেতাম!!! -জানুন সত্য ঘটনা

বদর যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে কাফের বাহিনী চরমভাবে পরাজিত হয়। অনেকেই নিহত হয়, অনেকেই যুদ্ধবন্দী হিসেবে গ্রেফতার হয়। বদর যুদ্ধের পর মক্কার কাফেররা তাদের বন্দী হওয়া আত্বীয় স্বজনদের মুক্তিপন দিয়ে মুক্ত করবে না বলে প্রাথমিকভাবে সিদ্বান্ত নেয়। কারন, তারা চায়নি মুসলমানদের কাছে তাদের দুর্বলতা প্রকাশিত হোক। কিন্তু অনেকেই তাদের আপনজনদের মুক্ত করার জন্য এ সিদ্বান্ত মেনে নিতে পারেনি। তাই মক্কার বিভিন্ন পরিবার তাদের আত্বীয় স্বজনদের মুক্তিপনের বিনিময়ে মুক্ত করতে যায়, আর এই মুক্তিপন ব্যাক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়েছিলো।

বদরের যুদ্ধে আবদুল্লাহ বিন উবাই (মুনাফিক দলের নেতা আবদুল্লাহ বিন উবাই নয়) নামের একজন লােক মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। তার পিতার নাম উবাই বিন খালফ। সে মদীনায় গিয়ে ৪,০০০ দিরহাম মুক্তিপণ দিয়ে তার পুত্রকে মুক্ত করে। পুত্রকে মুক্ত করে নিয়ে মদীনায় থাকতেই উবাই রাসূলুল্লাহ (সা) -এর সংগে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে। দাম্ভিকতার সাথে সে বলেছিল, ”হে মুহাম্মদ! আমার একটি ঘােড়া আছে যাকে আমি প্রচুর ভালো ভালো খাবার দিয়ে শক্তিশালী করে তুলছি। কেননা পরবর্তী যুদ্ধে ঐ ঘােড়ায় চড়েই আমি তােমাকে হত্যা করবাে।” রাসূলুল্লাহ (সা) উত্তর দিয়েছিলেন, ”না, তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে না; বরং আল্লাহর ইচ্ছা হলে আমিই রাসূলুল্লাহ (সা) তােমাকে তােমার ঘােড়ার পিঠে হত্যা করবাে। লােকটি অবজ্ঞাসূচক হাসি হেসে পুত্রকে নিয়ে চলে গিয়েছিল।

ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানরা প্রাথমিকভাবে খুব ভালো অবস্থানে থাকলেও আয়নায়ন পাহাড়ে নিয়জিত তীরন্দাজ বাহিনীর ভুলের কারনে পরবর্তীতে কোনঠাসা হয়ে পড়ে। কোরেশরা পাল্টা আক্রমণ করে বসে। কোরেশদের পাল্টা আক্রমণের প্রথম পর্যায় শেষ হলে তারা পরবর্তী আক্রমণের প্রস্তুতির জন্য কিছুটা পিছু হটে। রাসূলুল্লাহ (সা) -এর সংগীরাও এই সময় কিছুটা স্বস্তি বােধ করেন। একজন মুসলিম লক্ষ্য করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কাঁধের উপর দিয়ে খুব সতর্কতার সাথে কি যেন দেখছেন। লােকটি কারণ জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ (সা) স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেন, ”আমি উবাই বিন খাফকে আশা করছি। সে পিছন দিক থেকে আমাকে আক্রমণ করতে পারে। তাকে আসতে দেখলে আমার নিকট পৌঁছতে দিও।” তার কথা শেষ হতে না হতেই একজন লোক ইকরামার দল থেকে বের হয়ে একটি অতিকায় শক্তিশালী ঘােড়ায় চড়ে ধীর পদক্ষেপে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। সে হুঙ্কার করে বলে, ”ওহে মুহাম্মদ আমি এসে গেছি, আজকের দিন তােমার অথবা আমার।” এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা) এর কিছু সাহাবি লােকটির মুকাবিলা করার অনুমতি প্রার্থনা করেন, কিন্তু তিনি বলেন, ”তাকে আসতে দাও।” তাঁর সংগীরা দূরে সরে লােকটির আসার রাস্তা করে দেয়। উবাই বিন খাফ ঘােড়ায় চড়ে রাসূলুল্লাহ (সা) -এর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। সে দেখলাে তাঁর সংগীরা পথ ছেড়ে দিয়েছে। সে রাসূলুল্লাহ (সা) কে তার জন্য অপেক্ষা করতে দেখে এবং আক্রোশভরা তৃপ্তি লাভ করে এই ভেবে যে, এই লােকটিকেই সে হত্যা করতে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সা) ছিলেন বর্ম দ্বারা সজ্জিত। তিনি একটি হেলমেট পরেছিলেন যার দু’পাশের ঝুলন্ত অংশ তাঁর গণ্ডদেশকে আবৃত করেছিল। তাঁর তরবারি কোষবদ্ধ অবস্থায় চামড়ার বেল্টের সংগে বাঁধা ছিল। হাতে ছিল বর্শা। উবাই রাসূলের শক্তিশালী ও চওড়া কাঁধ লক্ষ্য করলাে। সে তার দীর্ঘ ও কঠোর হাতের দিকে তাকালাে যে হাত সহজেই একটি বর্শাকে দুটি টুকরাে করতে সক্ষম। সেই মুহূর্তে যােদ্ধা হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে খুব জাঁকজমকপূর্ণ দেখাচ্ছিল।

বর্তমান সময়ের খুব স্বল্প সংখ্যক লােক জানেন যে, নবী মুহাম্মদ (সা) তাঁর সময়ের শক্তিশালী মুসলিমদের একজন ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত শক্তিমত্তার সংগে ঐশী শক্তি যােগ হওয়ায় যে কোনাে ব্যক্তির নিকট তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। কিন্তু উবাই ছিল নির্ভীক। কিছুক্ষণ পূর্বেই সে একজন মুসলিমকে শহীদ করেছে তাই তার মনােবল ছিল অনেক বেশি। রাসূলুল্লাহ (সা) সহজেই তার সাহাবিদেরকে বলতে পারতেন উবাইকে হত্যা করার জন্য এবং তারাও আদেশ পেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সংগীদেরকে দূরে সরে দাঁড়ানাের আদেশ দিয়েছিলেন। এবারে তিনি কারও কাছ থেকে কোনাে সাহায্য চাননি। এটা ছিল তাঁর আত্মমর্যাদা ও শৌর্যবীর্যের প্রশ্ন। তাই মুহাম্মদ (সা) একাই শৌর্যমণ্ডিত আরবের মতাে প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তার মুকাবিলা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। উবাই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট পৌঁছে ঘােড়ার লাগাম টেনে ধরে। তার মধ্যে কোন তাড়াহুড়া ছিল না। সে মুহূর্তের জন্য ভাবতে পারেনি যে, মুহাম্মদ (সা) তার জন্য প্রতীক্ষা করে ছিলেন। তাই সে ধীরে সুস্থে তরবারি কোষমুক্ত করতে থাকে। কিন্তু তার বিলম্ব হয়ে যায়। কেননা ইতিমধ্যেই রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর বর্শা তুলে উবাইর বুকের উপরের অংশ বরাবর আঘাত হানেন। উবাই সামনে ঝুঁকতে চেষ্টা করে, কিন্তু তাতেও বিলম্ব হয়ে যায়। বর্শা তার ডান দিকে কাঁধে ঘাড়ের গােড়া বরাবর আঘাত হানে। আঘাত সামান্য হলেও উবাই ঘােড়া হতে পড়ে যায় এবং এর ফলে তার পাজরের একটি হাঁড় ভেঙে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) দ্বিতীয়বার আঘাত হানার পূর্বেই উবাই পিছনে ফিরে আর্তনাদ করতে করতে তার সহযােগীদের দিকে দৌড়াতে থাকে।

তারা তাকে থামিয়ে কীভাবে কি ঘটেছে জানতে চাইলে সে কম্পিত কণ্ঠে বলে,”আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ আমাকে হত্যা করেছে।” কোরেশগণ তার আঘাত পরীক্ষা করে বলে যে, এতে অস্থির হওয়ার কিছু নেই। কেননা আঘাতটির গভীরতা নেই এবং তা শীঘ্রই শুকিয়ে যাবে। উবাই উচ্চ কণ্ঠে আর্তচিৎকার করে বলতে থাকে, ”আমি মরে যাব।” কোরেশগণ তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলে উবাই নিজের উপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং ভীত – বিহবল কণ্ঠে বলতে থাকে,” আমি মরে যাব, মুহাম্মদ বলেছিলো যে, সে আমাকে হত্যা করবে। মুহাম্মদ যদি আমার উপর থুথুও নিক্ষেপ করতো তবুও আমি মরে যাওয়ার কথা। তারা নবীর বিরোধিতা করতো কিন্তু তারা জানতো যে মুহাম্মদ (সা) মিথ্যা বলেন না। উবাই ভয়ে আর স্থির হতে পারে না।

কোরেশগণ মক্কার পথে যাত্রা শুরু করলে উবাইও তাদের সংগে যায়। তারা মক্কার অদূরে সারাফ নামক স্থানে ক্যাম্প করে এবং সেখানে এই ঘৃণিত লােকটি মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুর কারণ অবশ্যই শরীরের ক্ষত নয়, কেননা তার ক্ষত দেখে মনে হয়নি খুব মারাত্বক, আল্লাহই সব ভাল জানেন।

আল্লাহ আমাদের সকলকে দ্বীনের পথে থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন।

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *