কোথা থেকে এলো নৌবাহিনীর ‘Admiral’ শব্দটি? জানুন বিস্তারিত

ইসলামের তৃতীয় খলিফা আমিরুল মুমিনিন হযরত উসমান ইবনু আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলে সিরিয়ার গভর্নর হযরত  মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শক্রমে ২৮ হিজরীতে  গঠিত হয় প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী। আমির মুয়াবিয়া (রাঃ) ছিলেন এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। প্রচণ্ড আগ্রহ ও উদ্দীপনার সাথে এই নতুন নৌবাহিনী পরীক্ষামূলক আক্রমণ করে সাইপ্রাসে। সাইপ্রাসবাসী আমির মুয়াবিয়া (রাঃ) এর কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠায়। তিনি ৭০০০ স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে তাদের সাথে সন্ধি স্থাপন করেন।এই প্রসঙ্গে একটি হাদীস প্রনিধানযোগ্য।

মুহাম্মাদ ইবনু সালামা এবং হারিছ ইবনু মিসকীন (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোবায় পদার্পণ করতেন, তখন তিনি মিলহান কন্যা উম্মে হারাসের নিকট যেতেন। তিনি তাকে আহার করাতেন। আর উম্মে হারাম বিনতু মিলহান (রাঃ) ছিলেন উবাদা ইবনু সামিতের (রাঃ) স্ত্রী। একবার তিনি তার বাড়িতে গেলে উম্মে হারাম তাকে আহার করালেন এবং তার মাথার উকুন তালাশ করতে বসে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিদ্রাভিভূত হলেন। এরপর তিনি হাসতে হাসতে জাগ্রত হলেন। উম্মে হারাম বলেন, আমি তাকে বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার হাসার কারণ কি? তিনি বললেনঃ আমার উম্মতের কিছু সংখ্যক লোককে আমাকে দেখান হলো তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার জন্য সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে, এবং তারা সিংহাসনে উপবিষ্ট বাদশাহ। রাবী ইসহাক (রহঃ) বলেন, অথবা তিনি বলেছেনঃ তারা সিংহাসনে উপবিষ্ট বাদশাহর ন্যায়। আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর নিকট দু’আ করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য দু’আ করে আবার নিদ্রা গেলেন।

হারিছ (রহঃ) বলেন, নিদ্রা যাওয়ার পর তিনি আবার হাসতে হাসতে জাগলেন, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার হাসার কারণ কি? তিনি বললেনঃ আমার উম্মতের কিছু লোককে আমাকে দেখান হলো, তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, যেমন সিংহাসনের উপর বাদশাহ অথবা বাদশাহর মত, যেভাবে প্রথমবার বলেছিলেন। আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর নিকট দুআ করুন, তিনি যেন আমাকে এদের মধ্যে শামিল করেন। তিনি বললেনঃ না, তুমি প্রথম দলে থাকবে।(সুনানে নাসাই, তাহক্বীকঃ সহীহ।)

উম্মে হারাম (রাঃ) মুআবিয়া (রাঃ)-এর সময় সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলেন, এরপর সমুদ্র হতে ফিরে আসার পর তিনি তার সওয়ারীর উপর হতে পড়ে শহীদ হন।

ওসমানিয়া (অটোমান) সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সুলতান, সুলতান সুলায়মানের সময় তাঁর নৌবাহিনী ছিলো জগদ্বিখ্যাত। তাঁর নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল (admiral) বা প্রধান ছিলেন খিজির খাইরুদ্দিন পাশা, যিনি হাইরেদ্দিন বারবারোসা নামেই বেশী পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বে অটোমান মুসলিমরা ভূমধ্যসাগরে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

বন্ধুরা খেয়াল করুন, খাইরুদ্দিন পাশা ছিলেন অটোমান নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল বা নৌপ্রধান। বর্তমান বিশ্বেও আমরা দেখতে পাই সাধারণত নৌবাহিনীর প্রধানদের পদবি অ্যাডমিরাল।

অ্যাডমিরাল শব্দটির সাথে আমরা কম-বেশি প্রায় সবাই পরিচিত হলেও আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি যে এই শব্দটির উৎপত্তি কোথায়?

আধুনিক যুগে কিছু কিছু নৌবাহিনীর অন্যতম সর্বোচ্চ পদ হল Admiral, আর অনেক দেশের নৌবাহিনীতে এটিই সর্বোচ্চ পদ। কমনওয়েলথভূক্ত দেশসমূহে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর Admiral হলেন সেনাবাহিনীর জেনারেল পদমর্যাদার একজন অফিসার ।

আরবী ‘আমিরুল বাহার’ ( أمير البحر )  এর বাংলা অর্থ ‘সমুদ্রের নেতা’। এই ‘আমিরুল’ বা ‘আমিরাল’ ( أمير الـ ) শব্দ থেকে মধ্যযুগীয় লাতিন শব্দ ‘admiralis’, ‘admirallus’, এংলো-ফ্রেঞ্চ শব্দ ‘amiral’ শব্দগুলোর উতপত্তি, আর এই শব্দগুলো থেকে ক্রমান্বয়ে বিবর্তিত হয়ে একসময় উতপত্তি লাভ করে ‘admiral’ শব্দটি।

এছাড়াও ‘Admiral’ শব্দটির উতপত্তি নিয়ে আরো কিছু মতামত রয়েছে। যেমন, দ্বাদশ শতাব্দীর সিসিলি শাসনকারী নর্মান  রাজা রজার-২  তার নৌবাহিনীতে নিয়োগ দেন ‘জর্জ অব এন্টিওক’ (george of antioch) কে যিনি ইতোপূর্বে উত্তর আমেরিকার অনেক মুসলিম শাসকের নৌবাহিনীতে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে তিনি আরবি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। রাজা রজার আব্বাসীয় ঢংয়ে জর্জকে ‘amir of amirs’ বা ‘নেতাদের নেতা’ উপাধি দেন যা পরবর্তীতে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ‘ammiratus ammiratorum’ হিসেবে লাতিন রূপ লাভ করে। সিসিলি এবং জেনোয়ার অধিবাসীদের মাধ্যমে পরবর্তিতে তা ‘অ্যামিরাল’ (amiral) হিসেবে সংক্ষিপ্ত রূপ লাভ করে। ফরাসি এবং স্প্যানিশরা তাদের নৌপ্রধানদের এই উপাধিতেই অভিহিত করেছিলো। পরবর্তীতে এই  ‘অ্যামিরাল’ শব্দটিই নানা পরিবর্তনের মাধ্যমে চতুর্দশ শতাব্দীতে ইংরেজি ‘admyrall’ এবং ষোড়শ শতাব্দীতে আধুনিক ‘অ্যাডমিরাল’ ( admiral) রূপ লাভ করে।

পরিশেষে বলা যায় ‘অ্যাডমিরাল’ ( admiral) শব্দটি বর্তমানে প্রচলিত রূপটি কিভাবে ধারণ করেছে তা নিয়ে কিছু মতভেদ থাকলেও এর উতপত্তি যে আরবি ‘আমিরুল বাহার’( أمير البحر )বা ‘সমুদ্রের নেতা’ উপাধি থেকে হয়েছে তা নিয়ে সসংশয়ের অবকাশ নেই বললেই চলে।

লিখেছেন- তৌকির আহমেদ

আপনিও লিখতে পারেন আমাদের জন্য; দ্বীনের জন্য এই ঠিকানায়- career@bismillaah.com

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *