মুসলিম সাগর পথের নাবিক, অভিযাত্রিক ও আবিস্কারক পর্ব ১: ইবনে মাজিদ (সাগরের সিংহ)

লেখক : মোহাম্মদ জলফিকার রিজন

বাংলাদেশে আমরা সবাই পর্তুগীজ নাবিক ভাস্কো দা গামা, ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নাম শুনেছি। কিন্তু ওই সময়ের সুপারস্টার নাবিক, সাগরের সিংহ নামে পরিচিত, ইবনে মাজিদের নাম প্রায় কেউই শুনি নাই, যার বই, এস্ট্রলেভ যন্ত্র আর সরাসরি পরামর্শ না পেলে ভাস্কোদামা আদো ভারতের উপকুলে আসতে পারতো কিনা সন্দেহ আছে। বাংলাদেশে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টায় মুসলিম ইতিহাস, আবিষ্কার, ঐতিহ্যকে ঢেকে রাখা হয়েছে, তার বড় উদাহরণ হলো, ইব্ন মাজিদ, Zhang হি (চাইনিস নেভি), পিরি রাইস (অটোমান নেভি), মানসা আবু-বকর (মালি সম্রাজ্য) এইসব মুসলিম নাবিক, অভিযাত্রীক, আবিষ্কারকের কোনো উর্ল্লেখ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কোথাও পাওয়া যায় না।

যাইহোক, ধারাবাহিক এক সিরিজে পাঁচ পর্বে পাঁচজন মুসলিম নাবিক, সাগর পথের আবিস্কারক এবং অভিযাত্রিকদের ইতিহাস তুলে ধরে চেষ্টা করবো।

“তিনিই তোমাদের জন্য নক্ষত্রপুঞ্জ সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা স্থল ও জলের অন্ধকারে পথ খুঁজে পাও । নিশ্চয় যারা জ্ঞানী, তাদের জন্যে আমি নির্দেশনাবলী বিস্তারিত বর্ণনা করে দিয়েছি।” – আল-কোরআন, সূরা:৬, আয়াত : ৯৭

ভারত মহাসাগরে ধীর্ঘ ৭০০ বছর বাণিজ্যিক নৌচলাচলে আরবদের একচছত্র আদিপত্য ছিল জোতিষবিদ্যা ও জাহাজ চালানোর পারদর্শিতার জন্য।  নাবিকবিদ্যা ও সমুদ্রবিদ্যায় পথিকৃতি এমন এক নাবিক, সাগরের সিংহ নাম পরিচিত, আহমেদ ইব্ন মাজিদ।  

১৫শো শতকের বিখ্যাত নাবিক, আবিস্কারক এবং সাগরের সিংহ নামে পরিচিত ইব্ন মাজিদের জন্ম ১৪৩২ সালে,ওমানের, জুলফার বন্দর নগরীতে। ভারত মহাসাগরের  আরব উপকূলীয় তার পরিবার, সমুদ্র অভিযান ও জাহাজ যুগে বাণিজ্যে লিপ্ত ছিল । তাদের কয়েকটা বাণিজ্যিক জাহাজ ছিল, যেগুলি দিয়ে তার দাদা এবং বাবা  কয়েকটি রুটে আরবের উপদ্বীপ থেকে ভারত এবং পূর্ব আফ্রিকান রাজ্যে বাণিজ্য করতো।

ইব্ন মাজিদের সাগরের অভিযানে যাওয়ার ঝোক অনেক ছোট বয়স থেকেই ছিল।  ইব্ন মাজিদ খুব মেধাবী ছিল, তিনি পুরু কোরানের হাফিজ ছিলেন। তিনি ৭ বছর বয়স থেকেই ন্যাভিগেশন আর সাগরের সম্পর্কে জানা শুরু করেন তার দাদা আর বাবার কাছ থেকে।

ইব্ন মাজিদ জুলফার পোর্টে প্রাক্তন নাবিক আর দূর দেশ থেকে আসা নাবিকদেড় কাছ থেকে আরবি ছাড়াও আরো ৫ টি ভাষা (ফার্সি, গ্রিক, তুর্কি,সুয়াহিলি ) শিখেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আরও তামিল ও আফ্রিকার কয়েক ধরণের ভাষা শিখেছিলেন।  ধর্মীয় বিদ্যার সাথে সাথে তিনি অঙ্ক, জেমিতি, জোতিষবিদ্যা, ভূগোল খুব ভালো ভাবে শিখেছিলেন । তিনি টলেমি, আল- মাররাকুশি, আল-সুফী, আল-টুসি, আকুল আল হামায়ই, ইব্ন সাঈদ, আল-বাত্তানি, ইব্ন-আউয়াল, উলুঘ বেগ এর বই ভালোমতো রপ্ত করেছিলেন।

১৪৫০ সালের দিকে দক্ষিণ চীন, ইন্ডিয়া, জাপান কোরিয়া, মালায়শিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে সিল্কের কাপড়, হলুদ, মরিচ, এলাচি, আদা ও অন্নান্ন মসলা সাগর পথে আরব দ্বীপপুঞ্জ, ইস্ট আফ্রিকা, এবং ইউরোপের মধ্যে ফ্লোরেন্স, ভেনিস এবং কনস্টান্টিপোল পর্যন্ত সাগরের মাদ্ধমে বাণিজ্যে আরব নাবিকদের দক্ষতার জন্য একচেটিয়া বাণিজ্য করতেছিলো। সদ্য কন্সটিনোপল দখল করা অটোমান সম্রাজ্য ওই সময় সামুদ্রিক মসলা বাণিজ্যে আসতে পারেনি পুরোপুরি ভাবে। ইউরোপিয়ান নাবিকরা তখনও ভুমদ্ধ সাগরের বাইরে খুব একটা বাণিজ্য করতে পারতোনা সুমুদ্র ও নাবিকবিদ্যায় পারদর্শিতার অভাবে।

ইবনে মাজিদ নাবিক বিদ্যায়, সাগরের পথ জানার জন্য ওই সময়ে তিনি সবচেয়ে উর্ল্লেখযোগ্য বেক্তি হিসেবে পরিচিতি পান।

চীনারা ১০০০ সালের দিকে কম্পাস আবিষ্কার করলেও, ইব্ন মাজিদ আধুনিক ৩২ পয়েন্ট সহ নাবিনেভিগেশনাল কম্পাস আবিষ্কার করেন।

ইব্ন মাজিদ বাতাসের গতি পরিমাপ করার জন্য এক অভিনব ডিভাইস আবিষ্কার করেন এবং পরবর্তীতে এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ঘুড়ির মাধ্যমে সংকেত পাঠানোর পদ্ধতি তৈরী করেন।

ইব্ন মাজিদ কামাল নামক অসাধারণ কিন্তু সহজ এক সেক্সট্যান্ট যন্ত্র আবিষ্কার করেন। যা মধ্যে সাগরে থাকা অবস্থায় অবস্থান নির্ণয়ের জন্য সময়ে অপরিহার্য।

তাছাড়া আঙুলের সাহায্যে অভিনব উপায়ে longitude নির্ণয়ের উপায় বের করেন।  

তার প্রথম বই ছিল ”সাগরের অবস্থান নির্ণয়ের শিক্ষা এবং ন্যাভিগেশন ” . এই বইতে তিনি সাগরের নৌযান চালানোর বিদ্যার ইতিহাস নিয়ে, আরবদের সাগরের মাদ্ধমে বাণিজ্যের সম্পর্কে, পূর্ব আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যতগুলো বন্দর নগরী আছে তার বিস্তারিত বর্ণনা দেন, তিনি আরো খোলা সাগরে, আর উপকূলের কাছে জাহাজ চালানোর পার্থক্য তুলে ধরেন। তিনি টাইফুন, হারিকান এর উৎপত্তি, ইন্ডিয়ান আর লৌহিত  সাগরের কোন কোন অঞ্চলে কোন কোন সময়ে হয় তা নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেন। তিনি মুনসন মৌসুমে  বাতাস ব্যবহার করে কিভাবে সহজে জাহাজ চালিয়ে বাণিজ্য করা যায় তা লিখেন। তিনি তার একশোর বেশি সাগর অভিযানের চিত্র এই বইতে রাখেন।

তার দ্বিতীয় বই টি সিলো সবচেয়ে বিখ্যাত ;  “সাগরে নৌবিদ্যার প্রয়োজনীয়  পদ্ধতি এবং নিয়ম”। এই বইটা ওই সময়ে জাহাজ চালানোর  জন্য এনসাইক্লোপেডিয়া , আরব জাহাজ, অটোমান সম্রাজ্য ও ইউরোপিয়ান নাবিকরা সবাই এই বইয়ের সাথে পরিচিত ছিল।

পর্তুগিজ নাবিক ভাসকো দা গামা, ইব্ন মাজিদের লিখা বই, অস্ত্রলেভ সব সময় তার সাথে রাখতেন।

১৪৯৮ সালে আফ্রিকার মানডিঙি বন্দরে ভাস্কোদাগামার সাথে দেখা হয় তার ঐতিহাসিক ভারতে আসার যাত্রার জন্য। যদিও প্রায় শত বছর ধরে আরব আর ভারতীয় নাবিকরা এই সমুদ্র পথে বাণিজ্য করে আছসিলো।  ভাস্কোদাগামা হলেন প্রথম ইউরোপিয়ান, জাহাজে ভারত আসার জন্য। যেহেতু এই পথে ইব্ন মাজিদ কম পক্ষে আরো ৫০ বার ভ্রমণ করেছেন, ভাস্কোদাগামা ইব্ন মাজিদের পরামর্শের জন্য দেখা করেন আফ্রিকার মানডিঙি বন্দরে।

তিনি সাগর অভিযান, নৌপথ, ন্যাভিগেশন সংক্রান্ত ৩৮টি বই লিখেন, যার মধ্যে ২৫ টি এখনো পাওয়া যায়। তার লিখা মানুক্রিপ্ট ফ্রান্স,দামেস্ক এবং রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গ এর জাদুঘরে এখনো প্রদর্শনে আছে । পৃথিবীর বিভিন্ন দ্বীপের, উপকূলীয় লাইট হাউসে এখনো ইব্ন মাজিদের বই ব্যবহার করা হয় ।

তার দেখানো বিভিন্ন প্রকারের বাতাস, জোয়ার ভাঁটার ধরণ, সাগরের ম্যাপ এর মধ্যে চার্ট, আকাশের তারা থেকে জাহাজ চালনার বিদ্যা কয়েকশো বছর নাবিকদের সাহায্য করেছে।  

বিভিন্ন পাখি দেখে কাছে কোন স্থলভাগ আছে তা বুঝতে পারা সম্পর্কে এবং তিনি ইন্ডিয়ান মহাসাগরের বড় বড় ১০টি দ্বীপ : আরাবিয়া, মাদাগাস্কার, সুমাত্রা, জাভা, তাইওয়ান, সিলন, জাঞ্জিবার, বাহরাইন, ইব্ন গায়ান আর সোকত্রা দ্বীপের সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন।

অটোমান নৌবাহিনীর এডমিরাল আর পৃথিবীর ম্যাপ বানানোর জন্য বিখ্যাত পিরি রাইস, বলেছিলেন ” ইব্ন মাজিদের বই আর নির্দেশিত পথ  ছাড়া ভারত মহাসাগরে বর্ষার মৌসুমে জাহাজ চালানো প্রায় অসম্ভব। “

প্রায় অর্ধশত বছর বিভিন্ন সাগরে, বন্দরে, রাজ্যে ঘুরে বেরিয়ে মহাসাগরের সিংহ নাম পরিচিত, ইব্ন মাজিদ ১৫০০ সালে মারা যান।

 ধর্মপ্রান আরব নাবিক আর সাগরে মাছ ধরার মাঝিরা আজও ইব্ন মাজিদের স্মরণে কোরানের প্রথম সূরা ফাতিহা পাঠ করে।

ইবনে মজিদকে নিয়ে বাংলা ডকুমেন্টারী:  https://youtu.be/Gkh9ebb_m6Y

© মোহাম্মদ জলফিকার রিজন

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *