রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সঙ্গে বিখ্যাত পালোয়ান রােকানার মল্লযুদ্ধ ও বাবলা বৃক্ষের ঘটনা

লেখক:আতিয়া ফাইরুজ

মানব জাতির শুরু হতে যুগে যুগে পৃথিবীতে যত নবী আগমন করেছেন তাদের সকলের দ্বারাই কিছু অলৌকিক ও অস্বাভাবিক ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। নবীদের হতে প্রকাশিত এসব অলৌকিক ঘটনাকে মুজিযা বলা হয়। মুজিযা একটি আরবি শব্দ। মুজিযাসমূহ তৎকালীন সময়ে নবীদের নবুয়তের পক্ষে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে। সেরকমই একটি মুজিযা হল রাসুলুল্লাহ ( সাঃ ) এর সঙ্গে বিখ্যাত পালোয়ান রােকানার মল্লযুদ্ধ ও বাবলা বৃক্ষের ঘটনা।

বাবলা বৃক্ষের ঘটনা

ইমাম বায়হাকী এবং আবু নােয়াইম আবু ইমামা হতে বর্ণনা করেন, প্রখ্যাত পালােয়ান রােকানা যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট মুজিযা দেখতে চাইল, তখন তিনি একটি বাবলা বৃক্ষকে এই বলে কাছে ডাকলেন যে, আল্লাহর হুকুমে তুমি আমার কাছে আস! প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আহবান শুনে বাবলা বৃক্ষটি তার খেদমতে এসে দাড়ালো। অতঃপর রাসুলুল্লাহর নির্দেশে পুনরায় সে আপন জায়গায় ফিরে গেল। 

মল্লযুদ্ধের ঘটনার বর্ণনা

কোরাইশ গােত্রে একজন বিশালদেহী শক্তিধর পালােয়ান ছিল। সে মাঠে বকরী চড়াত! একদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই মাঠের দিকে গেলে রােকানার সাথে সাক্ষাত হয়। এ সময় সেই নির্জন মাঠে তৃতীয় আর কেউ উপস্থিত ছিল না। রোকানা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, “আপনি আমাদের প্রভু সম্পর্কে কটু মন্তব্য করেন, আর ইবাদত করেন নিজের কাল্পনিক মাবুদের”।

রােকানা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরও বলল, “যদি আপনার সঙ্গে আমার আত্নীয়তার সম্পর্ক না থাকত তবে আজ আপনাকে পরপারে পাঠিয়ে দিতাম। আমার হাত হতে পরিত্রানের জন্য আপনার মাবুদের নিকট দোয়া করুন; আজ আপনার সত্যতার প্রমাণ হয়ে যাবে”।

অতঃপর রােকানা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার নবুওয়তের সত্যতা প্রমাণের জন্য এক অভিনব প্রস্তাব করে বলল, “আজ আমার সঙ্গে আপনাকে মল্লযুদ্ধ করতে হবে। বিজয়ের জন্য আপনার আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, আমিও লাত – উজ্জার (তৎকালীন সময় মানুষ লাত ও উজ্জা নামক মূর্তির পূজা করতো) কাছে সাহায্য চাইব। আপনি যদি আমাকে হারাতে পারেন তবে আমার বকরীর পাল থেকে আপনার পছন্দমত দশটি বকরী আপনাকে দিয়ে দিব। 

অবশেষে রােকানার সাথে যুদ্ধ হলো। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনায়াসেই তাকে পরাজিত করলেন। মক্কার বীর পালােয়ান রােকানা রাসূলুল্লাহর ঐশী শক্তির নিকট শোচনীয় ভাবে পরাজয় স্বীকার করল। কিন্তু পর মূহুর্তেই রােকানা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বলল, “আসলে আপনার নিকট আমার পরাজয় হয়নি, আপনার আল্লাহরই জয় হয়েছে। লাত – উজ্জা আমাকে সাহায্য করেনি। 

তাই আপনি আমার পিঠ মাটিতে লাগাতে পেরেছেন। আপনার পূর্বে আমার এই পিঠ ও পার্শ্বদেশ কেউ মাটি স্পর্শ করাতে পারেনি”। রােকানা এবার তার হৃত, গৌরব পুনরুদ্ধারের সংকল্প নিয়ে বলল, “আমার সঙ্গে আরেকবার লড়াই করুন। যদি এই বারও জয়ী হতে পারেন, তবে আরাে দশটি বকরী পাবেন”। কিন্তু রােকানা আবারও রাসুলাল্লাহর নিকট চরমভাবে পরাজয় বরণ করল।

এবারও সে নিজের পরাজয়ের জন্য লাত – উজ্জাকে দায়ী করে বলল,” আপনার আল্লাহরই জয় হয়েছে”। রােকানা তার পরাজয়ের গ্লানী মুছে ফেলতে তৃতীয়বারের মত মরিয়া হয়ে লড়াই করল। কিন্তু তার প্রতিপক্ষ ছিলেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এবারও সে ব্যর্থ হল। ব্যর্থ হবার পর তার মুখ থেকে লড়াই নিয়ে আর কোন কথা বের হল না। রােকানা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, “আমার পাল হতে ত্রিশটি বকরী বেছে নিয়ে যান”।

উত্তরে তিনি বললেন, “আমি বকরী নেব না, আমি চাই তুমি ইসলাম কবুল করে দোযখের আগুন থেকে পরিত্রান লাভ কর”। রােকানা এই প্রস্তাবের জবাবে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট মুজিযা দাবী করল। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাবলা বৃক্ষটিকে কাছে ডাকলেন, সঙ্গে সঙ্গে এটা ফেটে দু টুকরা হয়ে গেল। এরপর এটার একটি অংশ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও রােকানার নিকট আসে দাড়ালো।

অবশেষে রােকানা স্বীকার করল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজ বড় মুজিযা দেখিয়েছেন। অতঃপর সে বলল,” বৃক্ষটিকে তার পূর্বাবস্থানে ফিরে যেতে বলুন”। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তা হলে তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করবে”?  সে সম্মতি জানালো। এরপর রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে বৃক্ষটি তার অবস্থানে ফিরে গিয়ে উভয় টুকরো একসঙ্গে মিশে গেল। 

কিন্তু রােকানা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করল। সে বলল, আমি এখন ইসলাম গ্রহণ করলে মক্কার নারীরা আমাকে লজ্জা দিয়া বলে বেড়াবে যে, রােকানা পরাজিত ও প্রভাবিত হয়ে স্বধর্ম ত্যাগ করেছে এবং মুহাম্মদের কাছে নতি স্বীকার করেছে বীর রােকানা। অবশেষে, মক্কা বিজয়ের পরে সে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *