যুদ্ধে জয়ী না হয়েও খালিদ বিন ওয়ালীদ যেভাবে হয়ে যান সাইফুল্লাহ বা আল্লাহর তরবারী (পর্ব ১)

সাধারণ সৈন্য থেকে যেভাবে হয়ে গেলেন মুসলিম সেনাপ্রধান।

খালিদ বিন ওয়ালীদ আল্লাহর তরবারী হিসেবে বিখ্যাত। অসংখ্য যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া এ যোদ্ধার নাম ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরদিন। তাঁর রণকৌশল ছিল অনন্য, বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল দিয়েই তিনি যুদ্ধক্ষেত্র নিজের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতেন। রাসূল করীম (সা) তাঁকে সাইফুল্লাহ বা আল্লাহর তরবারি উপাধি দেন কিন্তু যে যুদ্ধের পর তিনি এ উপাধি পেয়েছিলেন সে যুদ্ধে তিনি কি মুসলিম বাহিনীকে বিজয় এনে দিতে পেরেছিলেন, নাকি যুদ্ধের ময়দান কাফেরদের হাতেই ছেড়ে দিয়ে আসেন ? চলুন দেখি খালিদ বিন ওয়ালীদের সাধারণ সৈন্য থেকে আল্লাহর তরবারি হয়ে উঠার কাহিনী।

নতুন বিশ্বাস ইসলামের জন্য যােদ্ধা ও কমান্ডার হিসাবে খালিদ (রাঃ) কি করতে পারেন তা প্রদর্শনের সুযােগ এলো তার মদীনা আগমনের তিনমাস পর । গাসসান গোত্রের প্রধানের নিকট ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত জানিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) একটি পত্র লিখেছিলেন । উক্ত পত্রবাহী দূত হারেছ ইবনে ওমায়ের আযদী মূতা অতিক্রমকালে স্থানীয় গাসসান প্রধান শুরাহনীল বিন আমর তাকে বাধা দেয় ও হত্যা করে । আরবদের দৃষ্টিতে এটা ছিল একটি জঘন্যতম অপরাধ । কেননা সে সময়ে কূটনৈতিক দূতকে , সে যতোই শত্রুভাবাপন্ন শক্তির প্রতিনিধিই হোক , সকল আক্রমণের উর্ধ্বে স্থান দেয়া হতো। এই খবরটি মদীনায় অগ্নিস্ফুলিংগের মতো ছড়িয়ে পড়ে । গাসসানদের উচিত সাজা দেয়ার জন্য দ্রুত একটি অভিযানের প্রস্তুতি নেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) যায়েদ বিন হারিসাকে উক্ত অভিযানের কমান্ডার নিযুক্ত করেন। যায়েদ যুদ্ধে শাহাদত বরণ করলে জাফর বিন আবু তালিব নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন এবং জাফরও শহীদ হলে কমান্ড যাবে আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহার হাতে। এই তিনজনের উপর নেতৃত্বের ধারাবাহিক দায়িত্ব অর্পণের পর রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন , “ যুদ্ধে এই তিনজনের সকলেই শহীদ হলে সৈনিকগণই তাদের মধ্য থেকে পরবর্তী কমান্ডার নির্বাচন করবে । ” তিন হাজার যোদ্ধার সমন্বয়ে মুসলিম বাহিনী গঠিত হয় যার মধ্যে খালিদ (রা) ও ছিলেন একজন সাধারণ সৈনিক ।

 রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিম দূতের হত্যাকারীকে খুঁজে বের করে তাকে হত্যা করার ও মূতার জনগণের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌছানোর দায়িত্ব যায়েদের উপর ন্যস্ত করেন এবং তিনি তাদের আশ্বাস দেন যে , মূতার জনগণ ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না। অভিযানে যাত্রার প্রাক্কালে শত্রুসৈন্যের শক্তি সম্পর্কে মুসলিম বাহিনীর নিশ্চিত কোন ধারণা ছিল না ।

মদীনা হতে যাত্রার প্রাক্কালে মুসলিম বাহিনীর মনোবল ছিল অত্যন্ত উঁচু । মান নামক স্থানে পৌছার পর প্রথম খবর এলো যে, পূর্বরোমের সম্রাট হেরাক্লিয়াস ১,০০,০০০ রোমান সৈন্য নিয়ে জর্ডানে উপস্থিত এবং তার সংগে যোগদান করেছে গাসসানের ১,০০,০০০ আরব খৃস্টান । মুসলিম বাহিনী তাদের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে বাকবিতণ্ডার মধ্যদিয়ে এ দুদিন অবস্থান করে । তাদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। অনেকে শত্রু সৈন্যের বিশালতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) কে অবহিত করার পরামর্শ দেয় যাতে তিনি পরবর্তী সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। কিন্তু আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (ধারাবাহিক নেতৃত্বের তৃতীয় ব্যক্তি) এই পরামর্শ পালনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। কারণ এতে অহেতুক বিলম্ব হবে এবং এর ফলে এমন ধারণার সৃষ্টি হবে যে , মুসলিমগণ ভীত। কেননা মুসলমানরা কখনো সংখ্যা দিয়ে জেহাদ করে না। তিনি পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত পাঠ করে সৈনিকদের মনোবল বৃদ্ধির লক্ষ্যে আবেগময় বক্তৃতা দান করেন ।

يَا قَوْمِ، وَاللهِ إنَّ الَّتِي تَكْرَهُونَ لَلَّتِي خَرَجْتُمْ تَطْلُبُونَ، الشَّهَادَةُ- وَمَا نُقَاتِلُ النَّاسَ بِعَدَدِ وَلاَ قُوَّةٍ وَلاَ كَثْرَةٍ، مَا نُقَاتِلُهُمْ إلاَّ بِهَذَا الدِّينِ الَّذِي أَكْرَمَنَا اللهُ بِهِ، فَانْطَلِقُوا فَإِنَّمَا هِيَ إحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ إمَّا ظُهُورٌ وَإِمَّا شَهَادَةٌ. قَالَ: فَقَالَ النَّاسُ: قَدْ وَاللهِ صَدَقَ ابْنُ رَوَاحَةَ-

‘হে আমার কওম! আল্লাহর কসম! তোমরা যেটাকে অপসন্দ কর, নিশ্চয় তোমরা সেটা অন্বেষণের জন্যই বের হয়েছ। আর তা হ’ল ‘শাহাদাত’। আমরা মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করিনা সংখ্যা দ্বারা, শক্তি দ্বারা বা আধিক্য দ্বারা। আর আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করিনা কেবলমাত্র এই দ্বীনের স্বার্থ ব্যতীত। যার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। অতএব সামনে বাড়ুন। নিশ্চয় এর মধ্যে কেবলমাত্র দু’টি কল্যাণের একটি রয়েছে। হয় বিজয় নয় শাহাদাত। অতঃপর সকলে বললেন,قَدْ وَاللهِ صَدَقَ ابْنُ رَوَاحَةَ অবশ্যই, আল্লাহর কসম! ইবনু রাওয়াহা সত্য বলেছেন’। এরপর তিনি সকলের উদ্দেশ্যে ৮ লাইনের একটি স্বতঃস্ফূর্ত কবিতা পাঠ করেন’।

এই বক্তৃতা শুনে মুসলিম বাহিনীর সকলের মনের সকল দ্বিধা – দ্বন্দ্বের অবসান হয় এবং তারা দ্রুত সিরিয়ার উদ্দেশে অভিযান শুরু করে । মুসলিম বাহিনী বর্তমান জর্ডানের পশ্চিমে বলকা জেলার সীমান্ত বরাবর পৌছে আরব খৃস্টানদের বিশাল বাহিনীর সম্মুখীন হয় । স্থানটি যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত বিবেচিত হওয়ায় মুসলিম কমান্ডারগণ তাঁদের বাহিনীকে প্রত্যাহার করে মূতায় নেন। আরব খৃস্টানগণ মুসলিম বাহিনীকে অনুসরণ করে এবং দুই বাহিনী মূতায় মুখোমুখি হয়। মুতা জর্দানের বালকা এলাকার নিকটবর্তী একটি জনপদ। এই জায়গা থেকে বায়তুল মাকদেসের দূরত্ব মাত্র দুই মানযিল।

উভয় পক্ষই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সময়টি ছিল ৬২৯ খৃস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ (৮ হিজরীর জমাদিউল – আউয়াল মাসের তৃতীয় সপ্তাহ)। যায়েদ সাধারণ ভংগিতে মধ্যবর্তী অবস্থান থেকে দুবাহু বিস্তার করে সৈন্য সমাবেশ করেন। বাহিনীর দক্ষিণ বাহুর নেতৃত্বে ছিলেন কুতায়বা বিন কাতাদা এবং বামবাহুর নেতৃত্বে উবাইয়া ইবন মালিক। যায়েদ স্বয়ং ছিলেন মধ্যবর্তী অবস্থানের নেতৃত্বে এবং খালিদও ছিলেন এখানেই। যুদ্ধক্ষেত্রটি বর্তমান মূতা গ্রাম হতে পূর্বদিকে এক মাইল বিস্তৃত। সামান্য উঁচুনীচু ছাড়া জায়গাটি ছিল সমতল। মুসলিম বাহিনী উত্তরমুখী হয়ে আরব খৃস্টানদের মুকাবিলা করেছিল। তাদের পিছনে ছিল হালকা উঁচু পর্বতশ্রেণী । খৃস্টান বাহিনীর নেতা ছিলো মালিক বিন জাফিলা, সে তার বাহিনীকে অনেকগুলো সারিতে সাজিয়ে মুসলিমদের মুকাবিলা করে।

অনেক ঐতিহাসিক তাদের সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন ১,০০,০০০ ; অনেকে মনে করেন ২,০০,০০০। এই হিসাব কোনটাই ঠিক নয়। শক্র সংখ্যা ছিল সম্ভবত দশ থেকে পনের হাজারের মধ্যে। এই যুদ্ধে মুসলিমগণ বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হয়। তাই অনুমান করা যায় যে , শত্রু সৈন্য সংখ্যা শুধু দ্বিগুণ হলেও মুসলিম বাহিনী তাদেরকে ঘায়েল করতে সক্ষম হতো। মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করার জন্য প্রতিপক্ষকে বহুগুণ শত্রুসৈন্যের সমাবেশ ঘটাতে হইয়েছে। মূলত এই বিবেচনার ভিত্তিতেই শক্রর শক্তি সম্পর্কে উল্লেখিত সংখ্যার নির্ধারণ করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হলে উভয় বাহিনীই দ্রুত একে অপরের উপর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। যুদ্ধটি পরিচালিত হচ্ছিল সামরিক দক্ষতার পরিবর্তে সাহস ও শক্তির দ্বারা। যায়েদ স্বয়ং মুসলিম বাহিনীর পতাকা হাতে সম্মুখভাগে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং কিছুক্ষণ পর শাহাদত বরণ করেন।

তাঁর হাত থেকে পতাকা পড়ে যাওয়ার সংগে সংগেই নেতৃত্বের দ্বিতীয় ব্যক্তি জাফর তা তুলে নেন এবং বাহিনীর সম্মুখ ভাগে থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকেন। এসময় তাঁর ঘোড়া শাক্বরা (شَقْرَاءُ) নিহত হয়। অতঃপর মাটিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধাবস্থায় তাঁর ডান হাত কর্তিত হয়। তখন তিনি বাম হাতে ঝান্ডা আঁকড়ে ধরেন। এরপর বাম হাত কর্তিত হয়। তখন বগলে ঝান্ডা চেপে ধরেন। আঘাতে আঘাতে জাফরের শরীর ক্ষতবিক্ষত হলে জাফরও মাটিতে পড়ে যান এবং পতাকারও পতন ঘটে দ্বিতীয় বারের মতো। জাফরের পতন মুসলিম বাহিনীকে অত্যন্ত মানসিক ক্লেশের মধ্যে ফেলে দেয়। কেননা রাসূলুল্লাহ  (সা) -এর চাচাতো ভাই হিসেবে তিনি ছিলেন বিশেষ শ্রদ্ধা ও অনুরাগের পাত্র। এ সময় তাদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা – দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। কিন্তু নেতৃত্বের তৃতীয় ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা দ্রুত পতাকা হাতে তুলে নিয়ে বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব কায়েম করেন। তিনিও শাহাদতের পূর্ব পর্যন্ত সাহসিকতার সংগে যুদ্ধ করে যান।

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *