যুদ্ধে জয়ী না হয়েও খালিদ বিন ওয়ালীদ যেভাবে হয়ে যান সাইফুল্লাহ বা আল্লাহর তরবারী (পর্ব ২)

আপনি যদি প্রথম পার্ট না পড়ে থাকেন তাহলে আগে এটা পড়ুন

যুদ্ধে জয়ী না হয়েও খালিদ বিন ওয়ালীদ যেভাবে হয়ে যান সাইফুল্লাহ বা আল্লাহর তরবারী (পর্ব ১)

আল্লাহর তরবারী

আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পর মুসলিম বাহিনীর মধ্যে প্রকৃত বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়। তাদের কয়েকজন যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নের চেষ্টা করলে তাদেরকে ফিরিয়ে আনা হয়। অন্যেরা দু-তিন জনের বা আরও বড় দলে বিভক্ত হয়ে দ্বিধা – দ্বন্দ্ব সহকারে শত্রুকে প্রতিহত করতে থাকে। ভাগ্যক্রমে শত্রু মুসলিম বাহিনীর এই নেতৃত্বহীনতার সুযোগকে কাজে লাগাতে পারেনি। তা করলে মুসলিম বাহিনীকে সহজেই বিতাড়িত করা সম্ভব ছিল। সম্ভবত মুসলিম নেতৃত্বের নির্ভীকতা ও সৈনিকদের কথা বিবেচনা করে শত্রুগণ সাহসী পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত ছিল।

আব্দুল্লাহর হাত হতে পতাকা পড়ে যাওয়ার সংগে সংগে সাবিত বিন আরকাম তা তুলে নিয়ে উচ্চ কণ্ঠে চিৎকার করে বলেন , “ হে মুসলিমগণ ! নিজেদের মধ্য থেকে সর্বসম্মতিক্রমে একজন নেতা নির্বাচন করো। ” খালিদ (রা) তার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি তাকে লক্ষ্য করে পতাকাটি এগিয়ে দিলেন। খালিদ (রা) এ ব্যাপারে সজাগ ছিলেন যে , নতুন মুসলিম হিসেবে তার অবস্থান খুব উঁচুতে নয়। অপরপক্ষে সাবিত বিন আরকাম ছিলেন দীর্ঘদিনের মুসলিম। এই বিষয়টি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাখান করে বললেন , “ সাবিত ! আমার চেয়ে তুমিই বেশি যোগ্য। ” “ আমি নই এবং তুমি ছাড়া আর কেউ নয় ” সাবিতের উত্তর।

খালিদ (রা) ছিলেন মুসলিমদের জন্য অপ্রত্যাশিত ভরসা , কেননা তারা তার ব্যক্তিগত শৌর্য ও সামরিক দক্ষতা সম্পর্কে অবহিত ছিল। তারা সকলে একবাক্যে এই মননানয়নে সম্মতি জ্ঞাপন করে এবং খালিদ (রা) পতাকা হাতে নিয়ে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। যুদ্ধের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ এবং তা মুসলিম বাহিনীর জন্য যে কোন সময় চরম পরাজয় ডেকে আনতে পারত। খালিদের পূর্বের কমান্ডারগণ যুদ্ধ পরিচালনায় কৌশলের চেয়ে সাহসিকতার প্রয়োগ বেশি করেছিলেন। খালিদ (রা) অতি দ্রুত তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সুন্দরভাবে বিন্যস্ত শক্তিতে মোতায়েন করেন।

তার সামনে ছিল তিনটি পথ খোলা। প্রথমত গোটা বাহিনীকে যুদ্ধ হতে প্রত্যাহার করে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা। কিন্তু এই প্রত্যাহারকে পরাজয় বিবেচনা করে তার উপর গৌরবদীপ্ত মুসলিম বাহিনীকে কলংকিত করার অভিযোগ আসতে পারে। দ্বিতীয়, প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। এতেও পরাজয়ের আশংকা ছিল। কারণ শত্রু বাহিনী ছিল সংখ্যায় বহুগুণ। তৃতীয় এবং সর্বশেষ পথছিল প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়ে শত্রুকে বেসামাল করে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণের জন্য সময় লাভ করা। খালিদ (রা) সর্বশেষ পথটিই অবলম্বন করেন। কেননা এটা ছিল তাঁর স্বভাবের সংগে সংগতিপূর্ণ।

মুসলিম বাহিনী সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে প্রচণ্ড আক্রমণ রচনা করে। তারা খালিদের নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য তরংগের মতো সামনে অগ্রসর হয়। খালিদের সাহসী নেতৃত্ব মুসলিম সৈনিকদের মনে নতুন সাহসের সঞ্চার করে। যুদ্ধের গতি আরও প্রচণ্ড রূপ লাভ করে। এমনকি কিছু সময়ের জন্য হাতাহাতি ও মরণপণ যুদ্ধ চলে। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম বাহিনীর দক্ষিণ বাহুর কমান্ডার কুতায়বা সামনে অগ্রসর হয়ে খৃস্টান বাহিনীর কমান্ডার মালিককে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিহত করেন। ফলে শত্রুসৈন্য অনেকটা দমে যায় এবং দ্বিধা – দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে। তারা যুদ্ধরত অবস্থায় পিছনে হটতে থাকে। তাদের লক্ষ্য, পুনর্গঠনের জন্য সময় লাভ করা। এই সময়ে খালিদ (রা) প্রচণ্ড যুদ্ধে নয়টি তরবারি ভেঙে দশমটি হাতে নিয়েছেন।

খৃস্টান বাহিনী পিছু হটলে খালিদ (রা) সংঘর্ষে বিরতি দিয়ে তাঁর বাহিনীকে কিছুটা পেছনে সরিয়ে নেন। উভয় বাহিনী এখন উভয়ের নাগালের বাইরে বিশ্রাম ও পুনর্গঠনের অপেক্ষায় রত। শেষ দফা যুদ্ধটি সমাপ্ত হয় মুসলিম বাহিনীর পক্ষে। এই যুদ্ধে ১২ জন মুসলিম শহীদ হন। প্রতিপক্ষের নিহতের কোন হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে তা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা খালিদ (রা) -এর পূর্বের প্রত্যেক কমান্ডারই ছিলেন সাহসী ও দক্ষ যোদ্ধা এবং খালিদের হাতের নয়টি তরবারিই ভেঙে ছিল শত্রুসৈন্যের দেহের মধ্যে খালিদ পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখেন যে, যুদ্ধে চূড়ান্ত সাফল্যের সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি মুসলিম বাহিনীকে একটি লজ্জাজনক ও ভয়ানক পরাজয়ের কবল হতে ফিরিয়ে অসম্মান ও ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছেন। শুধু সাহস ও কৌশল দিয়ে এর বেশি আর কিছু করা যায় না। সে রাতেই তিনি মূতা হতে তাঁর বাহিনীকে প্রত্যাহার করে মদীনার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।

মুসলিম বাহিনীর প্রত্যাবর্তনের খবর মদীনায় পূর্বেই পৌছে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) ও মদীনায় অবস্থানকারী মুসলিমগণ তাঁদের সংগে সাক্ষাতের জন্য সামনে অগ্রসর হন। ওহুদের যুদ্ধের পর হতে মুসলিম বাহিনী কখনই শত্রুর মুকাবিলা হতে বিরত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র তাদের দখলে ফেলে আসেনি। তাই মূতা হতে প্রত্যাহারকারী বাহিনীর প্রতি মদীনা অবস্থানকারী মুসলিমদের মনোভাব ছিল খুবই খারাপ। তারা এই বাহিনীর সম্মুখীন হওয়ার সংগে সংগেই সৈনিকদের মুখের উপর ধুলো নিক্ষেপ করতে শুরু করে। তারা চিৎকার করতে থাকে , “তোমরা পালিয়ে এসেছো। তোমরা আল্লাহর পথ থেকে পালিয়ে এসেছো।

রাসূলুল্লাহ (সা) তাদেরকে বিরত করেন এবং বলেন , “তারা পালিয়ে আসেনি। আল্লাহর ইচ্ছা হলে তারা আবার যুদ্ধ করতে যাবে।” তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে বলেন, “খালিদ হলো আল্লাহর তরবারি। ” পরে খালিদের প্রতি অসন্তোষ দূরীভূত হয় এবং মূতার যুদ্ধে যে তিনি কি পরিমাণ প্রজ্ঞা , বিবেচনা ও সাহস প্রদর্শন করতে পেরেছিলেন তা সকলে উপলব্ধি করেন। তার নামের সংগে সাইফুল্লাহ শব্দটি যুক্ত হয়ে যায়। তিনি হয়ে যান ‘ আল্লাহর তরবারি‘। খালিদ (রা) -কে এই মহান উপাধিতে ভূষিত করার সময়ই রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জীবনের ভবিষ্যৎ যুদ্ধগুলোর সফলতার নিশ্চয়তার ইংগিত দান করেছিলেন।

কিছু কিছু ঐতিহাসিক মূতার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে জয়ী বলে বর্ণনা করেছেন , আবার অনেকেই বলেছেন ভিন্ন কথা। প্রকৃত অর্থে এটা জয় বা পরাজয় কোনটাই ছিল না। এটা ছিল একটি অমীমাংসিত যুদ্ধ। তবে যেহেতু মুসলিম বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রের দখল খৃস্টান বাহিনীর হাতে রেখে প্রত্যাহার করেছিল তাই অমীমাংসিত ফলাফলটি ছিল তাদের পক্ষেই। এটা খুব বড় বা গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল না। কিন্তু এই যুদ্ধে খালিদ (রা) একজন স্বতন্ত্র কমান্ডার হিসেবে তার দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছিলেন এবং এর ফলেই তিনি আল্লাহর তরবারি উপাধিটি লাভ করেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবাদের অনুসরন করার তৌফিক দান করুন, আমীন।

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *