ইসলামের আলোকে জিন জাতির ইতিহাস (পর্ব ২)

আতিয়া ফাইরুজ; ১৯ জুলাই ২০২১

জিনদের খাদ্যদ্রব্য

ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, এক রাত হুজুর (সাঃ)- কে মক্কায় অনুপস্থিত পেয়েছিলাম, আমরা ভেবেছিলাম হয়তো হুজুর (সাঃ) কাফেরদের আয়ত্তে চলে এসেছিলেন তাই তিনি দ্রুত সরে পড়েন। সে রাত আমরা সবাই খুব উৎকণ্ঠায় কাটিয়েছিলাম। সকালবেলা দেখা গেল। হুজুর (সাঃ) গারে হেরা গুহার দিক থেকে আসছেন।

সাহাবায়ে কিরাম হুজুর (সাঃ)- এর অনুপস্থিতির কথা জানতে চাইলে হুজুর (সাঃ) বলেন- আমার কাছে এক জিন এসে আমাকে দাওয়াত দেয় এবং আমি তার সাথে গিয়ে তাদের সবাইকে পবিত্র কুরআন পাঠ করে শুনাই। তারপর হুজুর (সাঃ) আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে তাদের অবস্থান দেখান এবং তাদের আগুনের চিহ্ন দেখান। জিনেরা হুজুর (সাঃ) এর কাছে কিছু পথ খরচ চায় যেহেতু তারা কোন এক দ্বীপের বাসিন্দা ছিল।

তখন হুজুর (সাঃ) বলেন, যে সমস্ত হাড্ডিতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে ( জবাই করার সময় যে সমস্ত প্রাণীর উপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে) সেগুলাে তোমাদের খাদ্য। যে সমস্ত হাড্ডিতে গোস্ত লাগানো আছে এবং সকল প্রকার গোবর তােমাদের খাদ্য। মুসলিম শরীফে বর্ণিত হুজুর (সাঃ) বলেন, হাড্ডি এবং গোবর দ্বারা ইস্তিঞ্জা করাে না কারণ এগুলো তোমাদের ভাই জিনদের খাদ্য।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- একদা নবী করিম (সাঃ) তাকে (আবু হুরায়রাকে) বলেন, আমার জন্য কিছু পাথর খুঁজে নিয়ে এসো আমি ইস্তেজাতে যাব, হাড় এবং গোবর এনাে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হাড্ডি এবং গোবরের বিশেষত্ব কি? হুজুর (সাঃ) তখন বললেন, এ দুটি বস্তু জিনদের খাদ্য।

জিনের আবাসস্থল

জিনরা সাধারণত নাপাক স্থানে বসবাস করতে বেশি ভালোবাসে। যেমন উটশালা, ঘোড়াশালা, সৌচাগারে এরা বসবাস করতে ভালোবাসে। এজন্য নবী করিম (সাঃ) এরশাদ করেন- দুর্গন্ধময় স্থান জিন ও শয়তানের আবাসস্থল তাই প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে, “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল খুবুশি ওয়াল খাবাইশ” এই দোয়া পড়ে প্রাকৃতিক প্রয়ােজনে বসলে জিনদের সম্মুখে পর্দা পড়ে যায়। এবং উলঙ্গ হওয়া জিনেরা দেখতে পারে না।

হুজুর (সাঃ) এরশাদ করেন, দুর্গন্ধময় স্থান জিনের আবাসস্থল। তাই তোমাদের কেউ শৌচাগারে প্রবেশ করার পূর্বে বিসমিল্লাহ বলে প্রবেশ করলে জিনদের সামনে পর্দা পড়ে যায় এবং তারা তাকে দেখতে পারে না। হুজুর (সাঃ) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে গমন করলে প্রথমে বিসমিল্লাহ পাঠ করতেন। তারপর উল্লেখিত দোয়া পাঠ করতেন। হযরত ইব্রাহীম নখয়ী (রা.) বলেন দুর্গন্ধময় ড্রেনে প্রস্রাব করতে নেই কারণ এ ধরনের স্থানে পেশাব করলে কঠিন রোগ হতে পারে এবং এ ধরনের রোগ সহজে ভাল হয় না।

মুসলমান জিনের আবাসস্থল

হযরত বিলাল বিন হারিস বলেন, একদা আমি হুজুর (সাঃ)- এর সঙ্গে কোন এক স্থানে ভ্রমণে গেলাম। হুজুর (সাঃ) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে এক স্থানে গমন করলে আমি পানির পাত্র নিয়ে গেলাম। সেখানে আমি কিছু লোকের শোরগোল শুনতে পেলাম। এরকম শোরগোল আমি পূর্বে কখনো শ্রবণ করিনি। প্রয়ােজন শেষে হুজুর (সাঃ) ফিরে এলে জিজ্ঞেস করলাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি আপনার পাশে মানুষের ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম। মানুষের এ ধরনের ঝগড়া আমি আর কোনদিন শুনিনি।” হুজুর (সাঃ) তাকে বললেন, “আমার নিকট মুসলমান ও মুশরিক জিন ঝগড়া করছিল। তারা আমার নিকট তাদের আবাসস্থল এর আবেদন করে। আমি মুসলমান জিনকে লোকালয় এবং পাহাড়ে এবং মুশরিক জিনকে খাড়ী, গর্ত এবং সমুদ্র উপকূলে বসবাসের স্থান করে দিলাম।”

সাপের বা ইঁদুরের গর্তে জিনেরা বসবাস করে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সরজিছ (রা.) থেকে বর্ণিত নবী করিম (সাঃ) গর্তে প্রস্রাব করতে নিষেধ করেছেন। লোকেরা হযরত কাতাদাহ (রা.) এর নিকট প্রশ্ন করল যে, গর্তে পেশাব করা নিষেধ কেন ? জবাবে তিনি বলেন, গর্ত হল জিনদের বসবাসের জায়গা। (আবু দাউদ)

জিনেরা পানিতেও বসবাস করে

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.) শুয়েছিলেন। তাদের গায়ে চাদর ছিল। চাদর দিয়ে তাদের শয়ন করাকে আমি গুরুত্ব দিলাম। এভাবে শুয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলে আমাকে জানানো হলো, হে আবু সাঈদ তুমি কি জান না যে, পানিতে জিন বসবাস করে। কথিত আছে যে, রাতে জিনেরা পানিতে বসবাস করে। এজন্য রাতের বেলা পানিতে পেশাব করা ও গোসল করা উচিত নয়। কারণ একটি মাখলুকের (জিনের ) কষ্ট হয়।

পানির ঝোপঝাড়ে জিন বসবাস করে

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাঃ) ঝোপঝাড়ে স্নান করতে নিষেধ করেছেন। জিজ্ঞেস করা হল, কেন? হুজুর (সাঃ) বললেন, তোমাদের কেউ এমন স্থানে গেল যেখানে কচি ঘাস রয়েছে এবং সেখানে পানি বুগলাতে থাকে যেহেতু এগুলাে তােমাদের ভাই জিনদের বসবাসের স্থান।

জিনদের বিয়ে – শাদী

জিনেরা পরস্পর বিয়ে শাদী করে এবং তাদের সন্তান সন্ততি জন্মায়। যেমন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, তোমরা কি আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে বন্ধুর গ্রহণ করছ? অর্থ তারা তোমাদের শত্রু। এটা দ্বারা বোঝা যায় যে, শয়তানদের (জিনদের) সন্তান-সন্ততি ও বংশধর আছে।

হযরত সালমান ফারসী (রা.) বলেন নবী করিম (সাঃ) তাকে উপদেশ দিয়ে বলেন, তুমি তাদের মধ্য থেকে হয়াে না যারা সবার আগে বাজারে প্রবেশ করে অথবা যারা সবার শেষে বাজার থেকে বের হয়। কেননা বাজার এমন জায়গা, যেখানে শয়তান ডিম বাচ্চা প্রসব করে রেখেছে। এ থেকে জানা যায় যে, ডিম থেকে শয়তানের বংশ বৃদ্ধি পায়। আর বৃদ্ধির বিবাহ-শাদী একান্ত আবশ্যক।

শয়তানের ডিম

হযরত শা’বী (রা.) বলেন শয়তান পাঁচটি ডিম দেয়। এ থেকেই তার সকল সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তিনি আরও বলেন, শয়তান একজন মুমিনকে পথভ্রষ্ট করতে রবিয়া ও মুযার গোত্রের লোকের চেয়েও অনেক বেশি লোকের সমাগম ঘটায়। —ইবনে আবু হাতিম

জিনদের সন্তান সন্ততি অসংখ্য

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা মানুষ ও জিনকে দশ ভাগে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে নয় ভাগই জিন এবং মাত্র এক ভাগ মানুষ। মানুষের একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করলে জিনের সন্তান হয় তখন ৯ টি। হযরত সাবিত বলেন যে, আমার নিকট বর্ণিত হয়েছে যে, ইবলিস বলেছিল, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আদমের উপর প্রভাবশালী করে দিন। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, মানুষের বক্ষ হল তাের বাসস্থান। শয়তান বলল, “হে আল্লাহ একটু বাড়িয়ে দিন।” আল্লাহ পাক বললেন, “মানুষের কোন সন্তান না হলেও তোর ১০টি সন্তান হবে।” শয়তান বলল, “হে পরওয়ারদিগার আরও বৃদ্ধি করুন।” আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তাদের তুই দাবার খুটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবি এবং তাদের ধন সম্পদ ও সন্তান সন্ততিতে তুই অংশীদার হয়ে যা। (-বায়হাকী, শোয়াবুল ঈমান)

জিনের সাথে মানুষের বিয়ে

জিনের সাথে মানুষের এবং মানুষের সাথে জিনের বিয়ে শাদী হতে পারে। উভয় জাতের মিলনে সন্তানও হতে পারে। যেমন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ ফরমান- (হে শয়তান)! তাদের অর্থ সম্পদ ও সন্তান সন্ততিতে শরীক হয়ে যা। প্রশ্ন হতে পারে মানুষের সম্পদ ও সন্তানের মধ্যে শয়তান কিভাবে শরীক হবে? এ প্রশ্নের জবাবে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ধন-সম্পদ হারাম পন্থায় উপার্জন করা অথবা হারাম কাজে ব্যয় করাই হচ্ছে ধন সম্পদে শয়তানের শরীকানা।

সন্তান সন্ততির মধ্যে শয়তান কয়েকভাবে শরীক হতে পারে। সন্তান অবৈধ ও জারজ হলে, সন্তানের মুশরিক সুলভ নাম রাখা হলে, তাদের লালন-পালনে অবৈধ পন্থায় উপার্জন করলে। – কুরতুবী

হযরত মুজাহিদ বলেন, কোন মানুষ যখন তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে এবং তখন বিসমিল্লাহ পড়ে না তখন দুষ্ট জিন প্রস্রাবের ছিদ্র পথে বসে যায় এবং পুরুষের সাথে সেও সহবাসে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ইহাকেই বলা হয়েছে শয়তান তোমাদের সন্তান সন্ততিতে শরীক হয়।

ইসলামের আলোকে জিন জাতির ইতিহাস (পর্ব ১)

ইসলামের আলোকে জিন জাতির ইতিহাস (পর্ব ৩)

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *