ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজি

আসিফুর রহমান; ৩০ জুলাই ২০২১

১২০৪ সাল। বাংলায় তখন চলছিলো সেন বংশের রাজাদের শাসন। বাংলার মানুষকে তারা আবদ্ধ রেখেছিলো উঁচু-নিচুর জাত প্রভেদ বা বর্ণ বৈষম্যে। তাদের শাসনামলে ব্রাহ্মণরাই ছিলো সমাজের প্রভু আর নিম্নশ্রেণীর লোক যারা ছিলো তারা শিকার হতো ব্রাহ্মণদের নির্যাতনের। সেনদের অত্যাচারে তখন অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বিশেষ করে যেই বৌদ্ধরা কয়েক ‘শ বছর ধরে বাংলায় রাজত্ব করেছিলো তাদের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া দুস্কর হয়ে দাঁড়ায়। অধিকন্তু শূদ্ররা ছিল সেনদের নিকট অধিক নিগৃহীত। এমনি বিপর্যস্ত সময়ে বাংলায় ন্যায়ের ঝান্ডা বুলন্দ করে এক ইনসাফের সমাজব্যবস্থা কায়েম করেন মহান তুর্কী বীর ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজি। তার বাংলা বিজয় ছিল এক অতি বিস্ময়কর ব্যাপার। মাত্র আঠারো জন সেনা নিয়ে তিনি আকস্মিকভাবে বাংলায় আক্রমণ করে বিনা যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন।

বাংলা বিজেতা এই মহান বীর ছিলেন আফগানিস্তানের সিস্তানের গরমসির(বর্তমানে দশত-ই-মার্গ) এর অধিবাসী এবং তুর্কীদের খালজ গোত্রভুক্ত। তার বাল্যকাল সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে মনে করা হয় দারিদ্রের পীড়নে তিনি গোত্র ত্যাগ করেন এবং নিজের কর্মশক্তির উপর ভর করে ভাগ্যান্বেষণে বের হন। প্রথমেই তিনি গজনির সুলতান মুহাম্মদ ঘুরির সৈন্যবাহিনীতে চাকুরিপ্রার্থী হয়ে ব্যর্থ হন। তখন নিয়ম ছিলো, প্রত্যেক সৈন্যকে নিজ ঘোড়া ও যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হতো। সামর্থ্যের অভাবে বখতিয়ার ঘোড়া বা ঢাল-তলোয়ার কিছুই যোগাড় করতে পারেননি। তাছাড়া আকারে খাটো, লম্বা হাত এবং কুৎসিত চেহারার অধিকারী হওয়ায় তিনি সেনাধ্যক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হন। গজনীতে ব্যর্থ হয়ে তিনি দিল্লিতে কুতুবউদ্দীন আইবেকের দরবারে হাজির হন। এখানেও তিনি একই কারণে চাকরি পেতে ব্যর্থ হন। অতঃপর তিনি বাদাউনে যান। সেখানকার শাসনকর্তা মালিক হিজবর-উদ্দিন তাকে নগদ বেতনে সেনাবাহিনীতে চাকরি প্রদান করেন। কিন্তু এমন চাকুরীতে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি অযোধ্যায় চলে যান।

অযোধ্যার শাসনকর্তা মুয়াজ্জম হুসামউদ্দীন বখতিয়ারের মধ্যে যে অসীম সাহসিকতা এবং দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করার যোগ্যতা ছিল তা বুঝতে পেরে তাকে ভগবৎ ও ভোইলি নামে দুটি জায়গীর প্রদান করে মুসলিম রাজ্যের সীমান্ত রক্ষায় নিযুক্ত করেন। তাছাড়া এসময়ে তিনি অশ্ব ও অস্ত্রসস্ত্রাদিও সংগ্রহ করেছিলেন। এখানেই বখতিয়ার তার ভাগ্যোন্নয়নের সম্ভাবনা দেখতে পান এবং এই দুটি পরগনাই পরবর্তীকালে তার শক্তির উৎস হয়ে ওঠে।

বখতিয়ারের জায়গীর সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় তিনি পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাজ্যগুলির সংস্পর্শে আসেন এবং স্বীয় রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাজ্যগুলিতে পূর্বে থেকেই তুর্কী আক্রমণের আতঙ্ক লেগে ছিলো। তার উপরে পারষ্পারিক অন্তর্বিরোধ লেগে থাকাতে সংঘবদ্ধ হওয়া তাদের জন্য সম্ভব ছিল না। বখতিয়ার খিলজীর জন্যে এটা ছিল উপযুক্ত সুযোগ। তিনি কিছু সৈন্য সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাজ্যগুলোতে একের পর এক আক্রমণ করতে থাকেন এবং প্রচুর মালে গনিমত লাভ করেন। এই সময় ঠিক রাজ্য বিস্তার করা তার উদ্দেশ্য ছিল না, বরং একটি বিরাট সেনাবাহিনী গঠন করে বড় একটা কিছু করাই তার পরিকল্পনা ছিল।

ঘোর, গজনী, খোরাসান প্রভৃতি অঞ্চলে বিদ্রোহ, যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাত হতে থাকায় তখনকার বহু অধিবাসী দেশত্যাগ করে ভারতে গমন করে ভাগ্যের অন্বেষণে ঘোরাফেরা করতে থাকে। তারা বখতিয়ারের বীরত্বের খ্যাতি শ্রবণ করে দলে দলে বখতিয়ারের সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। এভাবে তিনি হয়ে উঠেন প্রবল শক্তিশালী। অন্যদিক বখতিয়ারের খ্যাতির খবর কুতুবউদ্দিনের দরবারে পৌঁছলে তিনি তাকে সম্মানসূচক পরিচ্ছদ প্রেরণ এবং প্রচুর সম্মান প্রদর্শন করেন। এই সম্মান ও সমর্থন বখতিয়ারের মনোবল আরও বাড়িয়ে দেয়।

একদিন তিনি দু’শ অশ্বারোহী নিয়ে বিহার দুর্গ অভিমুখে যাত্রা করেন এবং দুর্গদ্বারে উপস্থিত হওয়ার পর প্রবল আক্রমণ শুরু হয়। স্বীয় শক্তি ও সাহসের বলে তিনি দুর্গদ্বার ভেদ করে অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন এবং দেখতে পান অধিকাংশ লোকের মস্তক মুন্ডিতাবস্থায়। তিনি তাদের হত্যা করে দুর্গ অধিকার করেন। এছাড়াও তিনি দুর্গে অনেক গ্রন্থ দেখতে পান এবং গ্রন্থের মর্মোদ্ধাদের জন্য একটি ঘোষণা প্রচার করা হয়। পুস্তকের মর্মোদ্ধারের মাধ্যমে জানা গেল স্থানটি প্রকৃতপক্ষে একটি শিক্ষায়তন। তৎকালে হিন্দুদের ভাষায় শিক্ষায়তনকে বিহার বলা হতো।

বিহার জয়ের পর বিপুল পরিমাণ গনিমত নিয়ে বখতিয়ার কুতুবউদ্দিনের দরবারে হাজির হন। কুতুবউদ্দিন আইবেক ছিলেন ভারতে মুহাম্মদ ঘুরীর প্রতিনিধি। কুতুবউদ্দিন বখতিয়ারকে প্রভূত সম্মান ও পুরস্কার প্রদান করেন। এতে দরবারে উপস্থিত আমিরদের মধ্যে একদল বখতিয়ারের সুখ্যাতি ও কুতুবউদ্দিন প্রদত্ত সম্মানে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। তারা বখতিয়ারের বিরুদ্ধে কুতুবউদ্দিনের নিকট কুৎসা রচনা করে তার মন বিষিয়ে তোলেন। ফলে তাকে পাগলা হাতীর সঙ্গে যুদ্ধ করে সাহসিকতার প্রমাণ দিতে বাধ্য করা হয়। তিনি একটি কুঠার হাতে হাতীর নাকে এমনভাবে আঘাত করেন যে হাতি ভীত হয়ে পলায়ন করেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে কুতুবউদ্দিন বখতিয়ারকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করেন। বখতিয়ার সমুদয় পুরস্কার তার বন্ধুবান্ধব এবং জনগনের মাঝে বিতরণ করেন। এরপর রাজকীয় বিশেষ পোশাক নিয়ে তিনি বিহারে প্রত্যাবর্তন করেন।

বিহার ও পাশ্ববর্তী এলাকা জয়ের ফলে খিলজীর নাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। রায় লক্ষন সেন তখন বাংলার মসনদে আসীন ছিলেন। একদিন তার দরবারের পন্ডিতরা বললেন যে,তাদের প্রাচীন গ্রন্থে লিখিত আছে বাংলা একদিন তুর্কীদের অধিকারে যাবে। সমগ্র উত্তর ভারতে তখন তুর্কীদের রাজত্ব কায়েম ছিলো এবং বখতিয়ার খিলজিও বিহার পর্যন্ত জয় করে নিয়েছেন। রাজা জিজ্ঞেস করলেন তাদের প্রাচীন গ্রন্থে বাংলা বিজয়ী তুর্কীর কোনো রূপ বা পরিচিতি আছে কিনা। পন্ডিতেরা বললেন, যে তুর্কী বীর বাংলা বিজয় করবেন তিনি হবেন আকৃতিতে খাটো,দেখতে কুৎসিত এবং তার হাতদ্বয় হাঁটু পর্যন্ত দীর্ঘ হবে। লক্ষণ সেন বিহারে গোয়েন্দা পাঠিয়ে জানতে পারেন বখতিয়ার পন্ডিতদের বর্ণনানুযায়ী খাটো,কুৎসিত ও লম্বা হাতওয়ালা ছিলেন। পন্ডিতেরা রাজাকে পরিবার পরিজন ও পারিষদ নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বললেন। কিন্তু রাজা রাজ্য ছেড়ে যেতে রাজী হলেন না। ব্রাহ্মণপন্ডিতেরা রাজাকে ফেলে চলে গেলেন এবং যে যেখানে পারে আশ্রয় নিলেন।

বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তে গঙ্গানদীর ধারে রাজমহলের গিরিপথে অবস্থিত ছিল তেলিয়াগড় ও সিকড়িগড় নামে সংরক্ষিত দুইটি দুর্গ। এই দুর্গ দুটি রক্ষা করতে পারলেই বাংলাকে বহিরাক্রমণ থেকে রক্ষা করা যেত। কেননা আক্রমণকারীরা তখন গঙ্গা নদীপথেই অভিযান পরিচালনা করতেন। লক্ষণ সেনও স্বভাবতই দুর্গ দুটি রক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি দুর্গে সৈন্য সমাবেশ করে শত্রুর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নেন। কিন্তু অভিজ্ঞ সমরবিদ বখতিয়ার খিলজি অভিযান পরিচালনার সময় পূর্বের আক্রমণকারীদের মতো গঙ্গাপথকে বেছে নেননি। তিনি তেলিয়াগড়ের দক্ষিণ দিকে বিস্তীর্ণ জঙ্গলাকীর্ণ স্থান ঝাড়খণ্ড দিয়ে অগ্রসর হন। ঝাড়জঙ্গল ভেদ করে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর সম্ভব না হওয়ায় তিনি সেনাবাহিনীকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে এক দলের পর অন্য দল অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর বখতিয়ার খিলজি নিজেই প্রথম দলটির নেতৃত্ব দেন।

অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে বখতিয়ার বাংলার রাজধানী নদীয়ায় পৌঁছলেন।বেশভূষা এবং তার শান্তশিষ্ট ভাব দেখে কেউ ভাবতেই পারেন নি ইনিই সেই বীর যার হাতে পতন ঘটতে চলেছে দীর্ঘকালের হিন্দুয়ানী শাসনের। লোকজন ভেবেছিল তারা ঘোড়া ব্যবসায়ী যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা লক্ষণ সেনের প্রাসাদে গিয়ে রক্ষীদের হত্যা না করেছিলেন। রাজা লক্ষণ সেন তখন মধ্যাহ্নভোজে বসেছিলেন এবং তার সামনে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত পাত্রে খাবার পরিবেশিত হচ্ছিল। এসময় যখন রাজপ্রাসাদের আর্তনাদ তার কানে এলো, তখন প্রকৃতাবস্থা সম্পর্কে অবগত হয়ে তিনি নগ্নপদে প্রাসাদের পশ্চাৎদ্ধার দিয়ে পলায়ন করেন এবং বিক্রমপুরে গিয়ে আশ্রয় নেন। ফলে নদীয়া বিনা যুদ্ধেই বখতিয়ার খিলজির অধিকারে চলে আসে। রাজার ফেলে যাওয়া সম্পদ, ভৃত্যবর্গ এবং অনেক হাতি বিজয়ীদের দখলে আসে।

বখতিয়ার যখন প্রাসাদে হামলা করেন তখন তার সাথে মাত্র ১৮ জন সেনা ছিলো, অবশিষ্ট সেনাবাহিনীর দুয়েকটি দল তখন নগরে প্রবেশ করেছিলো মাত্র। বিজয়ের পর বখতিয়ার নদীয়ায় তিনদিন অবস্থান করেন। এরপর উত্তরবঙ্গে এসে বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড় অধিকার করলেন। এটিও তিনি বিনা যুদ্ধে অধিকার করলেন। লক্ষণ সেনের নামানুসারে তখন এটির নাম ছিল লক্ষণাবতী, বখতিয়ার এর নাম লখনৌতি রাখলেন এবং স্বীয় রাজধানী সেখানে স্থাপন করে নতুন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করলেন। বখতিয়ার নিজে সুলতান ছিলেন না এবং সুলতান উপাধিও নেননি। তিনি সুলতান মুহাম্মদ ঘুরীর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে তার নামে খুৎবা পাঠ ও মুদ্রা প্রচলন করেন। তিনি তার অধিকৃত রাজ্যে অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা এবং খানকাহ নির্মাণ করেন।

কয়েক বছর পর বখতিয়ার যখন তিব্বতের পার্বত্য অঞ্চল এবং তুর্কিস্তান সম্পর্কে অবগত হলেন তখন তিনি তিব্বত অধিকারের সংকল্প করেন।এর কারন হতে পারে বখতিয়ার হয়তো চেয়েছিলেন তার জন্মভূমি তুর্কিস্তানের সাথে বাংলার সংযোগ স্থাপন করতে। এরপর তিনি সৈন্য প্রস্তুতিতে মনোনিবেশ করলেন এবং আনুমানিক ১০ হাজার সৈন্যের একবাহিনী তিনি গঠন করে একদিন তিনি তিব্বত অভিযানে বের হলেন। তিব্বত ও লখনৌতি রাজ্যের মধ্যবর্তী পার্বত্য তিন টি জাতির বসতি ছিল। এদের নাম কোচ,মেচ ও থারো। কোচ ও মেচ প্রধানদের মধ্যে অন্যতম আলী মেচ বখতিয়ারের হাতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং পার্বত্য অঞ্চলে পথপ্রদর্শক হিসেবে নিয়োজিত হন।

কয়েকদিন পর বখতিয়ার বর্ধনকোট নামক নগরে উপনীত হন এবং সম্মুখে বৃহৎ নদী (নদীটির নাম ছিলো বাকমতি এবং গঙ্গা বা পদ্মা নদীর চেয়ে তিনিগুণ বড়) থাকায় তিনি নদী পার না হয়ে নদীর তীর বেয়ে দশদিন চলার পর একটি সেতু দেখতে পান। তিনি প্রচুর সৈন্যসহ দুজন আমিরকে সেতুরক্ষায় নিয়োজিত করে সেতু অতিক্রম করে সামনে অগ্রসর হন। সেতুর অপর প্রান্তে ছিল কামরূপ রাজ্য। কামরূপ রাজা বখতিয়ার সম্পর্কে অবগত হয়ে দূত পাঠিয়ে বললেন, ঐ বছর তিব্বত আক্রমণ করা সমীচীন হবেনা,তিনি ফিরে গিয়ে পরবর্তী বছর আসলে কামরূপ রাজাও তার সঙ্গে অভিযানে যাবেন। কিন্তু বখতিয়ার কোনো অজুহাতেই তার পরামর্শ গ্রহণ করলেন না এবং অভিযান অব্যাহত রাখলেন। এরপর পঞ্চাশ দিন পর্যন্ত উঁচু মালভূমি, পর্বত,গিরিপথ ও কয়েকটি জনপথ পাড়ি দিয়ে একটি উন্মুক্ত সমভূমিতে পদার্পণ করলেন যেখানে একটি দুর্গ ছিল। দুর্গের অধিবাসী ও মুসলিম সৈন্যদের মধ্য দিনভর লড়াই চললো এবং মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে প্রচুর হতাহত হলো শত্রুপক্ষের কিছু সৈন্যকে তারা বন্দী করলো।

যুদ্ধক্ষেত্রে যখন রাত্রি নেমে এলো, তখন প্রতিপক্ষের যারা বন্দী হলেন তাদের অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানতে পারলেন যে, নিকটবর্তী একটি শহরে সেখানে প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য পরবর্তী দিন যুদ্ধের জন্য ময়দানে আসবেন। যুদ্ধবন্দীদের কাছ থেকে বখতিয়ার খিলজি যখন সে অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হলেন তখন তিনি এ বছর যুদ্ধ না করেই ফিরে যাওয়া সমীচীন মনে করলেন যাতে পরবর্তী বছর পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে অভিযান পরিচালনা করা যায়।

প্রত্যাবর্তনকালে তিনি সমগ্রপথে কোনো খাদ্যশস্যের অস্তিত্ব দেখতে পেলেন না। কামরূপ রাজা সব আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিলো। ফলে সেতু কাছে পৌঁছা অবধি সৈন্যরা ঘোড়া জবেহ করে খেতে লাগলো। সেতুর মুখে এসে তারা দেখতে পেলেন সেতুটি ভাঙা। সেখানে তারা কোনো নৌকাও দেখতে পেলেন না। এরপর বখতিয়ার খিলজি তাদের কোনো উচ্চ ভূমিতে বিশ্রাম নিতে বললেন এবং নৌকা সংগ্রহ ও নদী পারাপারের কোনো উপায় উদ্ভাবনের চেষ্টা করতে লাগলেন। তখন হিন্দুরা কামরূপ রাজার নির্দেশে তাদের চারদিক দিয়ে ঘিরে বন্দী করতে চেষ্টা করে। এমতাবস্থায় বখতিয়ার সৈন্যদের আক্রমণ করতে বললেন। ফলে সৈন্যরা একযোগে আক্রমণ করে নদীর দিকটি উন্মুক্ত করে নদীতে লাফ দিলেন। যদিও বখতিয়ার খিলজি সহ শ‘খানেক সৈন্য নদী পার হতে পেরেছিল,কিন্তু বাকী সব সৈন্য নদী গভীরতায় প্রাণ হারাল। এরপর বখতিয়ার দেবকোটে পৌঁছে অত্যাধিক মানসিক যন্ত্রণায় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। এই অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে তার অন্যতম আমির আলী মর্দান। বখতিয়ার খিলজি মানসিক যন্ত্রণার দরুন কারো সাথে দেখা করতেন না।একদিন আলী মর্দান কোনোক্রমে তার কাছে গিয়ে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। এই ঘটনা ঘটে ৬০২ হিজরি সনে।

তথ্যসূত্র:
১.তবকাত-ই-নাসিরী
—মিনহাজ-ই-সিরাজ
২.বাংলার ইতিহাস: মুসলিম বিজয় থেকে নবাবী যুগ পর্যন্ত
—ড.আব্দুল করিম

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *