উম্মে উমারা- নির্ভীক এক নারী, বিরত্ব ও ভালোবাসার কারণে রাসূল (সাঃ) থেকে যে দোয়া আদায় করে নেন

নাসীবা বিনতে ক্বাব আল মাযেনিয়্যা সবার কাছে পরিচিত ছিলেন উম্মে উমারা নামে। তিনি ছিলেন ১ জন আনসারী সাহাবি। তিনি বনূ নজ্জর গোত্রের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবনে ক্বাব রাসূল (সাঃ) এর সাথে বদর যুদ্ধে সঙ্গী ছিলেন। তাঁর ২ পুত্র হাবীব ও আব্দুল্লাহ ইসলামের জন্য শহীদ হন। যুদ্ধের ময়দানে তাঁর অসীম সাহসের জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। কোরআন হাদীসের জ্ঞানেও তাঁর দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।

হিজরতের পূর্বে হজ্জ্বের মৌসুমে আইয়্যামে তাশরীকের মাঝামাঝি রাতের প্রথম প্রহরের শেষ মুহূর্তে মিনা প্রান্তরের আকাবা উপত্যকায় কুরাইশদের সম্পূর্ণ অগোচরে ৭২ জন পুরুষ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মুখে এগিয়ে এলেন, তারা প্রত্যেকে একে একে তাঁর দু’হাতে নিজেদের হাত রেখে বাইয়াত গ্রহণ করলেন। এই মর্মে শপথের বাক্য উচ্চারণ করলেন যে, দুশমন থেকে তাঁকে তাঁরা রক্ষা করবে যেমনটি তাঁরা করে থাকে নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদের বেলায়। 

বাইয়াত শেষ হলে এগিয়ে এলেন ২ জন নারী। পুরুষদের মতো তারাও বাইয়াত গ্রহণ করলেন হাতে হাত রাখার পর্বটি ছাড়া। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের সঙ্গে হাত মেলাতেন না। এই দুই নারীর একজন পরিচিত ছিলেন উম্মে মানী’ নামে আর দ্বিতীয় জন ছিলেন নাসীবা বিনতে ক্বাব আল মাযেনিয়্যা, যিনি পরিচিত-উম্মে উমারা নামে। উম্মে উমারা ফিরে আসলেন মদীনায়, আল্লাহ তা’আলা প্রদত্ত সম্মান (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ লাভের চরম সৌভাগ্য) বুকে নিয়ে বাইয়াতের শর্তসমূহ পূরণ করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। মূলত ঐদিন যারা রাসূল (সাঃ) এর কাছে বাইয়াত গ্রহন করেছিলেন তারা সবাই ছিলেন মদীনার আদিবাসী। যা পরবর্তীতে রাসূল (সাঃ) এর মদীনা হিজরতের অবস্থান তৈরী করে।

ওহুদের যুদ্ধে উম্মে উমারার ছিলো এক বিরাট ভূমিকা। আহ্! কী যে উজ্জল সেই ভূমিকা! উম্মে উমারা ওহুদের ময়দানের উদ্দেশ্যে বের হলেন নিজের পানির পাত্রটি নিয়ে, উদ্দেশ্য তাঁর- আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামকারীদের তৃষ্ণা নিবারণ করা। আরও নিয়েছিলেন জখমের একগুচ্ছ পট্টি (ব্যাণ্ডেজের প্যাকেট) আহতদের সেবা দিতে ও জখমে ব্যাণ্ডেজ বাঁধতে। আশ্চর্যের কিছু নেই, কেননা ময়দানে থাকবেন তাঁর স্বামী আর কলিজার তিনটি অংশ। এক অংশ হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর অপর দুই অংশ হলো তার দুই পুত্র হাবীব ও আব্দুল্লাহ। তাছাড়া তুলনামূলকভাবে তার প্রাণপ্রিয় রাসূল আর আল্লাহর দ্বীন এর হেফাজতে দুশমনদের আক্রমণ প্রতিরোধকারী মুসলিম ভাইয়েরাও তার প্রিয় মানুষ। ওহুদের যুদ্ধে উম্মে উমারা নিজের দু’চোখে দেখছিলে কীভাবে মুসলিম বাহিনীর বিজয় মহা বিপর্যয়ে রূপান্তরিত হলো।

তিনি দেখলেন কীভাবে মুসলিম বাহিনীর কাতারে হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ল এবং একের পর এক তাদের লাশ পড়তে থাকল। কীভাবে তাদের পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে গেল আর তারা প্রাণ প্রিয় নবীজীর নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। অবশেষে মাত্র দশজনের বেশি কাউকেই তাঁর পাশে দেখা গেল না, যা দেখে এক কাফির চিৎকার করে বলতে লাগল মুহাম্মাদ খুন হয়েছে . . . মুহাম্মাদ খুন!!!

এমন মুহূর্তে উম্মে উমারা তাঁর পানির পাত্র ছুঁড়ে ফেলে, ক্ষিপ্র গতিতে আক্রান্ত চিতার মত ময়দানের দিকে ছুটে গেলেন।

উম্মে উমারা এর ভাষ্যমতে, তিনি বলেন ‘খুব সকালে আমি ওহুদের ময়দানে গেলাম, আমার হাতে ছিল একটি পানির মশক, যা থেকে আমি মুজাহিদ ভাইদের পানি পান করাব। একসময় আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম, শক্তি, বিজয় ও সাহায্যের পাল্লা তখন তার ও তার সঙ্গীদের দিকে ঝুঁকে ছিল। একটু পরেই মুসলিম বাহিনী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন ফলে তিনি পড়ে রইলেন সামান্য কয়েকজনের প্রহরার মধ্যে যাদের সংখ্যা দশের উপরে নয়। ফলে আমি, আমার স্বামী ও পুত্র দ্রুত এগিয়ে গেলাম তার নিকট। হাতের বালা যেমন কবজিকে ঘিরে রাখে আমরা ঠিক সেভাবেই তাকে ঘিরে রাখলাম আর আমাদের সকল শক্তি ও অস্ত্র দিয়ে তাঁর উপর থেকে আক্রমণ প্রতিরোধ করতে থাকলাম। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে তাকিয়ে দেখলেন মুশরিকদের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার কোন ঢাল আমার কাছে নেই। এরপর তার দৃষ্টি পড়ল পলায়নপর একজনের প্রতি যার নিকট ছিল একটি ঢাল। তিনি ডেকে তাকে বললেন, “তোমার ঢালটি এমন কাউকে দিয়ে যাও যে লড়াই করছে। লোকটি নিজের ঢাল ফেলে দিয়ে চলে গেল আমি সেটা তুলে নিলাম এবং রাসূলের প্রতি আক্রমণ ঠেকাতে লাগলাম।’

‘আমি প্রিয়নবীর প্রতিরক্ষায় তরবারি চালিয়ে, তীর ছুঁড়ে আমার সর্বশক্তি ব্যয় করতে করতে এক পর্যায়ে অক্ষম হয়ে পড়লাম। আমার শরীরের গভীর ক্ষতগুলো আমাকে অপারগ করে দিল। এমন এক কঠিন মুহুর্তে উত্তেজিত উটের মত চিৎকার করে ইবনে কামিয়া বলতে থাকল, ‘কোথায় মুহাম্মাদ ? গেল কোথায় . . . ?’

‘আমি আর মুছ’আব ইবনে উমায়ের আগলে দাঁড়ালাম তার পথ, তখন সে তরবারির আঘাতে মুছআবকে ভূপাতিত করল, আরেক আঘাতে তাকে হত্যা করে ফেলল এরপর ভয়াবহ আঘাত করল আমার কাঁধে, যাতে সৃষ্টি হল গভীর ক্ষত। তারপরও আমি তার উপর উপর্যুপরি আঘাত করলাম, কিন্তু আল্লাহর দুশমনের গায়ে ছিল দুইটি বর্ম।’

নাসীবা আল মাযেনিয়্যা (উম্মে উমারা) আরও বলেন, ‘যে মুহূর্তে আমার পুত্র রাসূলের উপর থেকে অবিরাম আক্রমণ প্রতিহত করে যাচ্ছিল হঠাৎ তাকে ভীষণ আঘাত করে বসল এক মুশরিক, যাতে তার বাহু কেটে বিছিন্ন হবার উপক্রম হল, ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে থাকল। আমি তার কাছে এগিয়ে গেলাম, সেখানে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলাম। কোমল সুরে তাকে বললাম, আমার বৎস! আল্লাহর জন্য উঠে পড়, আল্লাহর দুশমনদের খতম করতে এগিয়ে যাও, উঠ বৎস উঠ!!’

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে ফিরে তাকালেন আর বললেন, তুমি যা করতে পারলে এমনটি আর কে পারবে হে উম্মে উমারা? ! এরপর সেখানে এগিয়ে আসতে লাগল সেই লোকটি যে আমার পুত্রকে আঘাত করেছিল, তাকে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে বললেন, উম্মে উমারা! এই দেখ, এটাই তোমার পুত্রের ঘাতক। দৌড়ে আমি এক লাফে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তরবারি দিয়ে সজোরে আঘাত করলাম তার পায়ের নলায়, ধপাস করে পড়ে গেল সে।মাটিতে আমি তার কাছে এগিয়ে গেলাম, তরবারি ও বর্শার উপর্যুপরি আঘাতে তাকে শেষ করে দিলাম। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, তুমি তো তার কেসাস নিয়ে ফেললে, উম্মে উমারা। আল্লাহরই প্রশংসা করছি যিনি তোমাকে কেসাস গ্রহণে সফল করলেন, তোমাকে নিজের চোখেই তার পতন দেখিয়ে দিলেন।’

উম্মে উমারার দুই পুত্রের বীরত্বও পিতা-মাতার চেয়ে কম ছিল না। তাদের ত্যাগ ও কুরবানীও পিতা-মাতার চেয়ে তুচ্ছ ছিল না। তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন, ‘ওহুদের যুদ্ধে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ময়দানে হাজির হয়েছিলাম। লোকেরা যখন তার নিকট থেকে দূরে সরে পড়ল, আমি আর আমার মা তাঁর নিকটবর্তী হলাম তার উপর থেকে আক্রমণ ঠেকাতে ঠেকাতে। নবীজী জিজ্ঞাসা করলেন- তুমি কি উম্মে উমারার পুত্র?- আমি হ্যাঁ বললাম। তিনি বললেন মারো, আঘাত কর। তাঁর সামনে এক মুশরিককে লক্ষ্য করে প্রচণ্ড শক্তিতে একটি পাথর নিক্ষেপ করলাম, সাথে সাথে লোকটি মাটিতে পড়ে গেল, আমি পাথর ছুঁড়তে ছুঁড়তে তার উপর পাথরের স্তুপ বানিয়ে ফেললাম। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিলেন। দৃষ্টি একটু সরাতেই তাঁর চোখে পড়ল আমার মায়ের কাধের জখম, সেখান থেকে ফেটে ফেটে রক্ত ঝরছিল। তিনি সচকিত হয়ে বললেন ‘তোমার মাকে দেখ তোমার মায়ের ক্ষতস্থানে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দাও। রাসূল (সাঃ) তাঁর জন্য সেদিন দোয়া করেছিলেন এই বলে যে, আল্লাহ তোমাদের পরিবারের মধ্যে বরকত দান করুন। তোমার মায়ের মর্যাদা অমুক অমুকের চেয়ে উর্ধ্বে, আল্লাহ রহম করুন তোমাদের সকলের উপর।’

‘আমার মা তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এই দোয়া করুন আমরা যেন জান্নাতে আপনার সঙ্গে থাকতে পারি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করলেন, ‘ইয়া আল্লাহ ! জান্নাতে ওদেরকে আমার সঙ্গী বানিয়ে দাও।’ এই দোয়া শুনে আমার মা বললেন, ‘এর পরে আমি আর কোন কিছুরই পরোয়া করি না, দুনিয়াতে আমার যা হয় তাতে আমার কিছু আসে যায় না।’

উম্মে উমারা রাদিয়াল্লাহু আনহা ওহুদের ময়দান থেকে গভীর ক্ষত নিয়ে আর তাঁর জন্য রাসূলের বিশেষ সেই দোয়া নিয়ে ফিরে এসেছিলেন। আর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহুদের ময়দান থেকে ফিরলেন এই কথা বলে- ‘আমি যখনই ডানে, বামে তাকিয়েছি, দেখেছি উম্মে উমারা আমার প্রতিরক্ষায় লড়াই করছে।’

উম্মে উমারা একজন নারী সাহাবী হয়েও তার নামে লিপিবদ্ধ রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে অধিকাংশ যুদ্ধে শামিল থাকার বিরল গৌরব গাঁথা  ইতিহাস। তিনি হাজির ছিলেন হুদাইবিয়াতে, খাইবারে উমরাতুল কাযা-তে, হুনাইনে বাইয়াতে রিযওয়ানে কিন্তু ঐ সব কিছুকেই সামান্য মনে হবে যখন আবু বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসন আমলে সংঘটিত ‘ ইয়ামামার যুদ্ধে তাঁর ভূমিকার সাথে তুলনা করা হয়। সে ঘটনা নিয়ে হাজির হব পরবর্তী কোন পর্বে ইনশা-আল্লাহ।

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *