পৃথিবীর বুকেই যে ১০ জন সাহাবি জান্নাতের সুসংবাদ পেয়ে যান

১৪০০ বছরেরও বেশি সময়ের পূর্বে ইসলামের পথ চলা শুরু হয় আল্লাহর নির্দেশে হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা) এর হাত ধরে। সেই সময় মক্কার হেরা পর্বতের গুহায় যখন ধ্যানমগ্ন মুহাম্মদ (স)-এর কাছে মহান আল্লাহ জিব্রাইল (আ)-এর মাধ্যমে প্রথম ওহী নাজিল করেন, তখন এই দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন একা। প্রথম দিকে কাকে কি বলবেন বুঝতে পারছিলেন না। এরপর কাছের লোকদের কাছে একের পর এক এই জীবনব্যবস্থা প্রচার করতে শুরু করেন হজরত মুহাম্মদ (সা)।

রাসুলুল্লাহ (সা)-এর পর ইসলামের প্রচার-প্রসার ও ইসলামের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠায় তাঁর সাহাবিদের অবদান সবচেয়ে বেশি। যারা রাসুলের (স) আহ্বান মেনে নিয়ে তাঁর সঙ্গে দায়িত্ব পালনে সহযোগী হয়েছেন ও মৃত্যু পর্যন্ত ইমানের ওপর টিকে ছিলেন, তাদের বলা হয় ‘সাহাবি’। সাহাবিদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল- তাঁর সঙ্গীগণ কাফিরদের মোকাবেলায় কঠোর এবং নিজেরা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। তুমি তাদের দেখবে আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তৎপর, রুকু ও সিজদায় অবনত। তাদের মুখমণ্ডলে অজুর চিহ্ন থাকবে, তাওরাতে তাদের বর্ণনা এরূপই এবং ইনজিলেও।“ (সুরা আল–ফাতহ: ২৯)।

সাহাবিদের প্রশংসায় রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে তারাই সবচেয়ে ভালো মানুষ যাদের মাঝে আমি প্রেরিত হয়েছি।’ এমন আল্লাহর সন্তুষ্টি-প্রাপ্ত মানুষদের মধ্যে থেকে ছিলেন বিশেষ ‘দশজন’ সৌভাগ্যবান সাহাবি, যাঁরা তাঁদের বিশেষ আমল এবং সীমাহীন ত্যাগের মাধ্যমে পার্থিব জীবনেই লাভ করেছিলেন ‘জান্নাত’-এর সুসংবাদ! এঁমন সৌভাগ্যবান সাহাবিদের (রা.) বলা হয় ‘আশারায়ে মুবাশশারাহ’। আরবি আশারা শব্দের অর্থ দশ। আর মুবাশশারা শব্দের অর্থ সুসংবাদপ্রাপ্ত। অর্থাৎ যাঁরা দুনিয়ায় বেহেশতের সুসংবাদ পেয়েছেন তাদের আশারায়ে মুবাশশারা বা বেহেশেতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবি বলা হয়।

সাহাবিদের এই বিশেষ মর্যাদা দেয়ার কারণ অনেক। সেই সময়ে মুহাম্মদ (স)-এর চরম দুর্দিনে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার পাশে থেকেছেন, তাঁর সেই সংগ্রামে হাজারো নির্যাতন সহ্য করেছেন, দুনিয়ার সব ভোগ-বিলাসিতা ত্যাগ করেছেন, সামাজিক প্রতিপত্তি বিসর্জন দিয়েছেন- পৃথিবীর আর কোনো যুগের মানুষের পক্ষেই তা করা সম্ভব হবে না। তবে সাথে এটাও মনে রাখবেন যে, দুনিয়াতে শুধুমাত্র এই ১০ জন সাহাবিই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত হননি। আরো অনেকেই হয়েছিলেন। তবে এই ১০ জন সাহাবির ত্যাগ ও ইসলামের প্রতি দ্বায়িত্ববোধ তাঁদের অন্যদের তুলনায় নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। তাছাড়া এই ১০ জন সাহাবি একসাথে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত হওয়ায় তাঁদের ব্যাপার বেশি আলোচিত হয়েছে। চলুন তাহলে জেনে নেই সেই ১০ জন সাহাবি সম্পর্কে যারা দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়ে যান।

যেভাবে সুসংবাদ পেয়েছিলেন

সাহাবাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন চার খলিফা। তারা হলেন, হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা), হজরত উমর (রা), হজরত উসমান (রা) ও হজরত আলী (রা)। এঁদের পরবর্তী স্তরে রয়েছেন অবশিষ্ট আশারায়ে মুবাশশারারা।

জান্নাতের সুখবর সম্পর্কে আবু মুসা (রা) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি মদিনার একটি বাগানে রাসুল (সা)-এর সঙ্গে ছিলাম। এক ব্যক্তি এসে দরজায় করাঘাত করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তার জন্য দরজা খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।’ আমি দরজা খুলে দেখলাম, তিনি আবু বকর (রা)। আমি তাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফরমান অনুসারে জান্নাতের সুসংবাদ দিলাম। তখন তিনি মহান আল্লাহর প্রশংসা করলেন। এরপর উমর (রা.ল) এলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তাকে অনুমতি দাও এবং জান্নাতের সুসংবাদ দাও।’ এরপর উসমান (রা.) এলেন এবং অনুমতি চাইলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘অনুমতি দাও এবং জান্নাতের সুসংবাদ দাও।’ (বুখারি, হাদিস নম্বর : ৬৭৩০)

মুহাম্মদ (স.) নিজেও তার সাহাবীদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দেবেনা। কসম সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনাও ব্যয় করো তবুও তাদের যেকোনো একজনের অর্ধেক পরিমাণ যবের সমতুল্য হবে না।’

অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘আমার সাহাবিরা আকাশের তারকাসদৃশ। তাদের কোন একজনকে গ্রহণ করলে তোমরা সঠিক পথ পাবে। আর আমার সাহাবীদের পারস্পরিক মতপার্থক্য তোমাদের জন্য রহমতস্বরূপ।’

মুহাম্মদ (স) বলেন, ‘আবু বকর জান্নাতি, উমর জান্নাতি, উসমান জান্নাতি, আলী জান্নাতি, তালহা জান্নাতি, জুবায়ের জান্নাতি, আবদুর রহমান ইবনে আওফ জান্নাতি, সাদ জান্নাতি, সাঈদ জান্নাতি, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ জান্নাতি।’ (সুনানে তিরমিজি-৩৬৮০)।

তাঁরা ছাড়াও আরও কিছু সাহাবীকে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। যেমন- খাদিজা বিনতে খুওয়ালিদ (রা), হযরত হাসান ও হযরত হোসেইন (রা), আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রা), উক্কাশা বিন মুহছিন প্রমুখ। তবে এই দশজনকে ‘আশারায়ে মুবাশশারা বা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশব্যক্তি’ বলা হয়, কারণ এক হাদিসে একসাথে তাঁদের সবার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে অন্য সাহাবিদের মধ্যে যাঁরা বেহেশতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন, হজরত মুহাম্মদ (সা) তাঁদের নামের শেষে জান্নাতি যোগ করে সম্বোধন করতেন। তবে আজ ‘আশারায়ে মুবাশশারা’ সাহাবিদের পরিচিতি তুলে ধরার চেষ্টা করবো শুধু।

হজরত আবু বকর (রা)

হজরত আবু বকর (রা.)-এর পুরো নাম (আবু বকর) আবদুল্লাহ বিন আবি কুহাফা। তাঁর উপাধি সিদ্দিক, তিনি আবু বকর সিদ্দিক নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। আবু বকর (রা) রাসুল (সা) এর মিরাজের ঘটনা শোনামাত্রই বিশ্বাস করেছিলেন বলে, তাকে রাসুল (সা) ‘সিদ্দিক’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। ৫৭৩ সালের দিকে, মক্কার কুরাইশ বংশের ‘বনু তাইম’ গোত্রে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল উসমান আবু কুহাফা। আর মায়ের নাম সালমা উম্মুল খাইর।

আবু বকর (রা) সম্পর্কে বলা হয়েছে, অন্যান্য সবার ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কিছু মাত্রায় দ্বিধা ছিল, কিন্তু আবু বকর (রা) বিনা দ্বিধায় ইসলাম গ্রহণ করেন। বয়সে তিনি রাসূল (সা) এর চেয়ে অল্প ছোট ছিলেন। আবু বকর (রা.) ছিলেন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন প্রধান সাহাবি এবং ইসলামের প্রথম খলিফা। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে তিনিই প্রথম ইসলাম গ্রহণে করেন। এছাড়া তিনি রাসুল (সা) -এর স্ত্রী আয়েশা (রা)-এর পিতা ছিলেন। রাসুল (সা)-এর মৃত্যুর পর তিনি খলিফা হন এবং মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দেন।

৬৩৪ সালের ২২ আগস্ট ৬১ বছর বয়সে মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মসজিদে নববিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজার পাশেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)

হযরত উমর (রা)-এর পুরো নাম উমর ইবনুল খাত্তাব। এছাড়া আমিরুল মুমিনিন ও ফারুক নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। ন্যায়ের পক্ষাবলম্বন করার কারণে তাকে আল ফারুক (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) উপাধি দেওয়া হয়। ৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে, মক্কার কুরাইশ বংশের ‘বনু আদি’ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম খাত্তাব ইবনে নুফায়েল এবং মাতার নাম হানতামাহ বিনতে হিশাম। উমর (রা.) ৬১৬ সালে ৩৯ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন।

হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের আগে মুসলমানরা প্রকাশ্যে সালাত আদায় ও দাওয়াত দেয়া থেকে বিরত থাকতো, উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের পর, মুসলমানরা প্রকাশ্যে আসা শুরু করেছিলো। তিনি ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। আবু বকর (রা) ইন্তেকালের পর তিনি দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে নিযুক্ত হন। ইসলামি আইনের একজন অভিজ্ঞ ব্যাক্তি ছিলেন তিনি। ‘আমিরুল মুমিনিন’ বা ‘বিশ্বাসীদের নেতা’ উপাধিটি সর্বপ্রথম তাঁর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।

৬৩৪ সালের ২৩ আগস্ট থেকে ৬৪৪ সালের ৩ নভেম্বর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। রাসুল (সা)-এর রওজার পাশেই তাঁর সমাধি।

উসমান ইবনে আফফান (রা)

হযরত উসমান (রা) এর পিতার নাম আফফান ইবন আবি আল-আস এবং মাতার নাম আরওরা বিনতে কুরাইজ। তাঁকে যুননুরাইন (দুই নূরের অধিকারী) বলা হয়ে থাকে, তাঁর আরেকটি উপাধি আল-গনি (উদার), তবে তিনি আমির আল-মুমিনুন নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনিও কুরাইশ বংশের এবং ৫৭৬ সালে উক্ত বংশের উমাইয়া শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ঊর্ধ্ব পুরুষ আবদে মান্নাফে গিয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশের সাথে মিলিত হয়েছে।

উসমান (রা.) পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ‘আস-সাবেকুনাল আওয়ালুন’ (প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী)। তখন তাঁর বয়স ছিল ৩০ এর ওপরে। খলিফা হিসেবে তিনি চারজন খোলাফায়ে রাশেদিনের একজন। তিনি ছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা। তিনি সেই ৬ জন সাহাবির মধ্যে অন্যতম, যাঁদের ওপর হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আজীবন সন্তুষ্ট ছিলেন। ৬৪৪ থেকে ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ১২ বছর খিলাফতে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। ৬৫৬ সালে ১৭ জুন ৭৯ বছর বয়সে তিনি শাহাদাত বরন করেন।

আলী ইবনে আবু তালিব (রা)

আলী (রা)-এর পূর্ণ নাম আলী ইবনে আবু তালিব। এছাড়া বিশ্বস্ত দলপতি, আবু আল-হাসান (হাসানের পিতা), আবু তুরাব (ধূলিকণা/মাটির পিতা), আসাদুল্লাহ (আল্লাহর সিংহ) নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতার নাম আবদে মানাফ ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মাতার নাম ফাতিমা বিনতে আসাদ। ৬০০ সালে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও কুরাইশ বংশীয় এবং হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর চাচাত ভাই ছিলেন।

মাত্র দশ বছর বয়সে হজরত আলী (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। শিশু বয়স থেকেই মুহাম্মদ (সা)-এর সঙ্গে লালিত-পালিত হন। বালকদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় যোদ্ধা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ‘জুলফিকার’ নামক তরবারি উপহার দিয়েছিলেন।

হজরত আলী (রা.) খোলাফায়ে রাশেদিনের একজন ও ইসলামের চতুর্থ খলিফা। বিচক্ষণতা ও ফায়সালার ক্ষেত্রে আলী (রা.) ছিলেন সাহাবাদের মাঝে সবচেয়ে অভিজ্ঞ।

যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা)

যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা)-এর উপনাম হাওয়ারিয়্যু রাসুলিল্লাহ। তাঁর পিতার নাম আওয়াম এবং মাতার নাম সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব। তিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা) অন্যতম। তাঁর অন্যতম গুনগুলোর মধ্যে দানশীলতা, উদারতা, আমানতদারিতা, পরোপকারিতা ইত্যাদির জন্য সুপরিচিত ছিলেন।

সাঈদ বিন যায়দ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আবু বকর এবং উমর জান্নাতি। আলী জান্নাতি। তালহা জান্নাতি এবং যুবাইর জান্নাতি।’ (মুসনাদে আহমদ, ১/১৮৭; আবু দাউদ, হাদিস নম্বর : ৪৬৫০)।

যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা) হাবশায় হিজরতকারী দলের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। হাবশায় কিছুকাল অবস্থান করেন। অতঃপর ফিরে আসেন মক্কায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরত করার পর, তিনিও মদিনায় হিজরত করেন। অসাধারণ সাহসীকতার কারনে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর জন্য ছিলেন ত্রাস।

হজরত যুবাইর (রা)- হিজরি ৩৬ সালে শাহাদাতবরন করেন।  শাহাদাতের পর তার লাশ ইরাকের ‘আসা সিবা’ উপত্যকায় দাফন করা হয়।

তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা)

তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা)- রাসূল (সা) এর অন্যতম ঘনিষ্ঠ একজন সাহাবি। তাঁর জন্ম ৫৯৪ সালে মক্কায়। মৃত্যু ৬৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর, মৃত্যুর সময় তালহার বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর।

সাঈদ বিন যায়দ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আবু বকর জান্নাতি। উমর জান্নাতি। উসমান জান্নাতি। তালহা জান্নাতি।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নম্বর : ১৫৩৪)

আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা)

আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) এর পিতার নাম আউফ এবং মায়ের নাম শেফা। তাঁর পিতা-মাতা উভয়েই ছিলেন ‘যোহরি’ নামক গোত্রের। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাতা আমিনাও ‘যোহরি’ গোত্রের ছিলেন। তাঁর মূল নাম ছিল ‘আবদুল আমর’ বা ‘আবদুল কাবা’। ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা) তাঁর নাম রাখেন ‘আবদুর রহমান’। ডাক নাম ‘আবু মুহাম্মাদ’। আনুমানিক ৫৮০ সালে তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফ জান্নাতি।’ (মুসনাদে আহমদ ১/১৮৮; আবু দাউদ, হাদিস নম্বর ৪৬৪৯)

আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী প্রথম ৮ জন ব্যক্তির মধ্যে অন্যতম। হযরত আবু বকর (রা), আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা)-কে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং হজরত মুহাম্মদ (সা)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানান। এখান থেকেই হজরত আবু বকর (রা)-এর দাওয়াতে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে হাজির হন এবং ইসলাম কবুল করেন।

আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) ৩৩ হিজরি মোতাবেক ৬৫৩-৬৫৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমান জর্ডানের আম্মানে তাকে দাফন করা হয়।

সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা)

সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা), তার পিতার নাম আবু ওয়াক্কাস মালেক এবং মাতার নাম হামনা। তিনি ‘যোহরি’ গোত্রের লোক ছিলেন। আনুমানিক ৫৯৫ সালে মক্কায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

হযরত আবু বকর (রা)-এর দাওয়াত পেয়ে সা’দ (রা) রাসুল (সা)-এর কাছে হাজির হন এবং ইসলাম ধর্ম কবুল করেন। সা’দ (রা) মাত্র ১৭ বছর বয়সে ইসলাম কবুল করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে ১৭তম ব্যক্তি।

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম যুদ্ধ হচ্ছে বদরের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে হজরত সা’দ (রা) অসম্ভব সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেন। ওহুদের যুদ্ধের সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে যে সমস্ত সাহাবা নবীজিকে হেফাজত করার জন্য তাকে ঘিরে ব্যূহ রচনা করেছিলেন এবং নিজেদের জানকে বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন, হজরত সা’দ (রা) ছিলেন তাদেরই একজন। সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা)-কে উহুদ যুদ্ধের বাঘও বলা হয়ে থাকে। হজরত সা’দ (রা) অত্যন্ত মর্যাদাবান একজন সাহাবা ছিলেন। খোলাফায়ে রাশেদীন সহ অন্য সাহাবারাও তাকে অত্যন্ত সমীহ করে চলতেন।

রাসুল (সা) বলেন, ‘এবং সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস জান্নাতি।’ (মুসনাদে আহমদ, ১/১৮৭)

সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা)-এর ডাকনাম আবু ইসহাক। তিনি ৬৩৭ থেকে ৬৩৮ সাল পর্যন্ত তিসফুনের গভর্নর, ৬৩৮ থেকে ৬৪৪ সাল পর্যন্ত বসরার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুসলিমদের পারস্য বিজয়ে নেতৃত্ব দেওয়াদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

৬৩৬ সালে পারস্য বিজয়ের নেতৃত্ব ও শাসনের জন্য তিনি অধিক পরিচিত। আনুমানিক ৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে পঁচাশি বছর বয়সে মদিনা থেকে দশমাইল দূরবর্তী আকিক উপত্যকায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মদিনার তৎকালীন গভর্নর ‘মারওয়ান’ তার নামাজে জানাজা পড়ান। মৃত্যুকালে হজরত সা’দ (রা)-এর অসিয়ত মোতাবেক, বদর যুদ্ধে তিনি যে জুব্বা পরেছিলেন সেই পুরনো জুব্বাটি দিয়েই তাঁর কাফন তৈরি করা হয়।

আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা)

আবু উবাইদার পুরা নাম আমর ইবনে আবদিল্লাহ ইবনুল জাররাহ (রা)। তিনি তাঁর বাবা আবদুল্লাহ’র নামে পরিচিত না হয়ে, দাদার নামে অর্থাৎ ইবনুল জাররাহ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁকে উপাধি দেয়া হয়েছিলো আমিনুল উম্মাহ বা উম্মাহর তত্তববধায়ক। আনুমানিক ৫৮১ সালে মক্কায় কুরাইশের বনু আল হারিস ইবনে ফিহর গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন।

আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা) ইসলামের প্রথম দিকে ইসলাম গ্রহণ করেন। হজরত আবু উবাইদা (রা) হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি ইসলামের জন্য বদর যুদ্ধে নিজের পিতাকে হত্যা করেন। তিনি ছিলেন রাসুলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। ওহুদের যুদ্ধে যে দশজন সাহাবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ঘিরে ব্যূহ রচনা করেছিলেন, যারা তাদের জান বাজি রেখে আল্লাহর নবীর হেফাজতের চেষ্টা করেছিলেন, উবাইদা (রা) তাদেরই একজন। যুদ্ধ শেষে যখন দেখা গেল, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুখমণ্ডল জখম হয়েছে ও দুটি দাঁত শহীদ হয়েছে এবং লৌহবর্মের দুটি বেড়ি গণ্ডদেশে ঢুকে গেছে, তখন হজরত আবু বকর (রা) এ দৃশ্য দেখে ছুটে এসে বেড়ি দুটি দ্রুত খোলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আবু উবাইদাহ তাকে বাধা দিলেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা) যাতে কষ্ট না পান, তাই তিনি দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে সাবধানে বেড়ি বের করে আনলেন। কিন্তু বেড়ি দুটো মারাত্মকভাবে ঢুকে যাওয়ার কারণে তা বের করতে উবাইদা (রা)-এর দুটো দাঁত ভেঙে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ব্যক্তি। রাসুলের নির্ভরযোগ্য সাহাবি। মুসলিমদের সিরিয়া বিজয়ে তিনি অনবদ্য ভূমিকা রাখেন।

৬৩৪ থেকে ৬৩৮ সাল পর্যন্ত লেভান্টের গভর্নর ছিলেন তিনি। আনুমানিক ৬৩৮ সালে ৭০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। হযরত সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস তাঁর গোসল ও কাফনের ব্যবস্থা করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান। জর্ডান উপত্যকায় তাঁকে দাফন করা হয়।

আবদুর রহমান বিন আউফ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আবু বকর জান্নাতি। আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ জান্নাতি।’ (মুসনাদে আহমদ ১/১৮৭; আবু দাউদ ৪৬৫০)

সাঈদ ইবনে যায়িদ (রা)

সাঈদ ইবনে যায়িদ (রা)-এর ডাকনাম ‘আবুল আওয়ার’। তার পিতার নাম যায়িদ এবং মাতার নাম ফাতিমা বিনতে বাজা। ৫৯৩ সাল মতান্তরে ৫৯৪ সালে তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।

সাঈদ ইবনে যায়িদ (রা) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তার বয়স ছিল মাত্র বিশ বছর। ইসলামের একদম প্রথম ভাগে যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, সাঈদ ইবনে যায়িদ (রা) তাঁদেরই একজন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও তিনি তৎকালীন পৌত্তলিকতা থেকে বিরত ছিলেন। তিনি ঐ সময়েও ছিলেন একেশ্বরবাদী যাঁরা ইবরাহিম (আ)-এর ধর্মপদ্ধতি ঐতিহ্যগতভাবে তখনো সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় ধরে রেখেছিল এবং তাঁর পূর্বসূরিরাও একেশ্বরবাদী ছিলেন।

নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘এবং সাঈদ ইবনে যায়িদ জান্নাতি।’ (আবু দাউদ, হাদিস নম্বর : ৪৬৪৯; তিরমিযি, হাদিস নম্বর : ৩৭৪৮; মুসনাদে আহমদ ১/১৮৯)

৬৭৩ সালের আগস্টে প্রায় ৮০ বছর বয়সে তিনি মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন।

আল্লাহ আমাদের সকলকে জান্নাতী হিসেবে কবুল করুন। আমীন।

Share this post on..

9 thoughts on “পৃথিবীর বুকেই যে ১০ জন সাহাবি জান্নাতের সুসংবাদ পেয়ে যান

  1. Hi there. I discovered your web site by way of Google while searching for a related matter, your web site came up. It seems great. I have bookmarked it in my google bookmarks to visit then. Glenda Kirby Som

  2. great points altogether, you just received a brand new reader. What could you recommend in regards to your put up that you simply made a few days in the past? Any sure? Dionne Sandor Buna

  3. Awesome write-up. I am a normal visitor of your blog and appreciate you taking the time to maintain the nice site. I will be a frequent visitor for a long time. Luella Farleigh Kellda

  4. Hiya, I am really glad I have found this info. Nowadays bloggers publish only about gossip and net stuff and this is really irritating. A good website with interesting content, this is what I need. Thanks for making this site, and I will be visiting again. Do you do newsletters by email? Tiphany Ozzy Cila

  5. After checking out a handful of the blog posts on your web page, I seriously like your way of blogging. I book marked it to my bookmark webpage list and will be checking back in the near future. Please check out my web site as well and tell me your opinion. Terza Clair Ansilme

  6. Having read this I believed it was really informative. I appreciate you taking the time and energy to put this article together. I once again find myself spending way too much time both reading and commenting. But so what, it was still worth it! Ginnie Bord Tawsha

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *