ইসলামের আলোকে জিন জাতির ইতিহাস (পর্ব ১)

আতিয়া ফাইরুজ; ১৯ জুলাই ২০২১

আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতা সৃষ্টি করেছেন বুধবারে, জিন জাতি সৃষ্টি করেছেন বৃহস্পতিবার এবং হযরত আদম (আ.)- কে সৃষ্টি করেছেন জুমআ’বারে। আল্লাহ তায়ালা জিন জাতিকে সৃষ্টি করে পৃথিবীর পৃষ্ঠে বসবাসের সুযোগ করে দিলেন। জিনেরা এখানে যথাসাধ্য ভাবে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত বন্দেগী করতে লাগল। এ অবস্থায় তারা অনেকদিন অতিবাহিত করল। এক সময় তারা আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি, রক্তারক্তি ও অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ল।

জিনদের ছিল এক বাদশাহ। তারা তাদের বাদশাহকে হত্যা করে ফেলে। তাই আল্লাহ তায়ালা দ্বিতীয় আসমান থেকে একদল সেনাবাহিনী তাদের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। এ বাহিনীকে জিন বলা হয়। তাদের সঙ্গে ইবলিস ছিল। সে ছিল চার হাজার জিনের কমান্ডার। তারা আসমান থেকে অবতরণ করে ভূপৃষ্ঠে বসবাসরত পাপিষ্ঠ জিনদের উপর আক্রমণ করে অনেককেই হত্যা করে।

কিছুসংখ্যক জিনকে সমুদ্রের দিকে তাড়িয়ে দিয়ে তাদেরকে সমুদ্রের বিভিন্ন দ্বীপে নির্বাসন দেয়া হয়। তারপর ইবলিস তার বাহিনীসহ ভূ-পৃষ্ঠে বসবাস করতে থাকে। তাদের উপর অনেক কাজ-কর্ম সহজ হয়ে গেল এবং তারা ভূপৃষ্ঠকে পছন্দ করে নিল। বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আ.)- এর দু’হাজার বছর পূর্বেই জিন জাতির সৃষ্টি এবং ইবলিস হযরত আদম (আ.)-এর চল্লিশ বছর পূর্ব থেকে ধরা পৃষ্ঠে বসবাস করে আসছিল।

শয়তান মরদুদ (অভিশপ্ত) হওয়ার কাহিনী

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, একসময় ইবলিস ও ফেরেশতাদের এক গোত্রের সাথে রাখা হত। তাদেরকে জিন বলা হত।  ইবলিসের নাম ছিল হারিস। সে জান্নাতের অন্যান্য পাহারাদারদের মত একজন পাহারাদার ছিল। ভূপৃষ্ঠে সর্বপ্রথম জিনরাই বসবাস করত এবং তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। আল্লাহ পাক এদের শায়েস্তা করার জন্য ইবলিসের নেতৃত্বে কিছু ফেরেশতা সৈন্য প্রেরণ করেন। এ কাজ ইবলিসের নেতৃত্বে হওয়ায় ইবলিসের অন্তরে অহংকার দেখা দেয়। সে বলতে লাগল আমি যা করেছি তা আর কেউ করতে পারেনি।

আল্লাহ পাক ইবলিশের অন্তরের খবর অবগত হলেন কিন্তু ফেরেশতারা তা অবগত নয়। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা যখন ফেরেশতাদেরকে জানালেন যে, “ভূপৃষ্ঠে আমি আমার প্রতিনিধি পাঠাতে চাই।” তখন ফেরেশতারা নিবেদন করলেন যে, হে আল্লাহ আপনি ভূপৃষ্ঠে তাদেরকে প্রেরণ করবেন যারা বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, খুনাখুনি করবে, যেমন করেছিল জিনেরা? আল্লাহ পাক বললেন, “আমি যা জানি তোমরা তা আদৌ জান না। আমি ইবলিসের অন্তরে গর্ব অহংকার দেখতে পাচ্ছি যা তোমরা ফেরেশতা দেখছ না।”

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-কে ঠুনকো মাটি দ্বারা সৃষ্টি করে তার মাটির দেহ চল্লিশ রাত ইবলিসের কাছে রেখে দিলেন। ইবলিস প্রাণহীন আদমের পাশে আসত এবং সে তার পেছন দিক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে মুখ দিয়ে বের হয়ে যেত। অতঃপর সে বলত, এটা তো কিছুই না, যদি তুমি সৃষ্টি না হতে তাহলে কি ক্ষতি। তোমার উপর আমাকে শক্তিমান করে দেয়া হলে আমি তোমাকে ধ্বংস করে দেব। আমাকে তোমার উপর প্রভাবশালী করে দিলে, তোমাকে আমি পাপ কাজে উৎসাহিত করব।

আল্লাহ পাক হযরত আদম (আ.)-এর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করার পর সকল ফেরেশতাকে আদেশ করলেন নব সৃষ্টি আদমকে সেজদা করার জন্য। ফেরেশতারা সিজদা করলেন কিন্তু ইবলিশ সিজদা করতে অস্বীকার করে বসল। তার অন্তরে যে অহংকারের সূচনা হয়েছিল তার বহিঃপ্রকাশ ঘটল। তারপর সে বলল আমি তাকে সিজদা করবো না, আমি তার চেয়ে উত্তম, বয়সে বড় এবং আমি শারীরিকভাবে তার চাইতে শক্তিশালী। তখন থেকে আল্লাহ তায়ালা তার কাছ থেকে যাবতীয় কল্যাণ ছিনিয়ে নিলেন এবং তাকে শয়তান, মরদুদ ঘোষণা করলেন।

জিনের সৃষ্টি ধোঁয়াবিহীন আগুন দ্বারা

হযরত ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেহ (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তায়ালা নারে সামুম দ্বারা জিনজাতি সৃষ্টি করেছেন, এ আগুনে কোন ধোঁয়া ছিল না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ ফরমান, “ইতিপূর্বে (মানব সৃষ্টির পূর্বে) জিন কে লু-এর আগুনের দ্বারা সৃষ্টি করেছি (-সূরা হিজর ২৭)। আর ধোঁয়াবিহীন আগুনকে নারে সামুম বলে। সূরা আর রহমানে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ ফরমান, জিনকে আগুনের শিখা হতে সৃষ্টি করেছেন।

আয়াতে মারিজ শব্দের উল্লেখ রয়েছে। ‘মারিজ’ অর্থ শুধু আগুনের স্ফুলিঙ্গ যার সাথে কোন ধোঁয়া নেই। শুধু অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি বলে জিনদের স্বভাব – চরিত্র অত্যন্ত উগ্র। তাদের আদি পিতা আবুল জিন। আল্লাহ তায়ালা আবুল জিনকে সৃষ্টি করার পর তাকে জ্বিজ্ঞেস করলেন, “তােমার কোন আকাঙ্ক্ষা আছে কি?” আবুল জিন আল্লাহ তায়ালাকে বলল- হে আল্লাহ! আমার আকাঙ্ক্ষা হল যে, আমি যেন সবকিছু দেখতে পাই কিন্তু আমাকে যেন কেউ না দেখে।

আমরা যেন ভূ-পৃষ্ঠে আড়াল হয়ে যেতে পারি, আমাদের বৃদ্ধেরা যেন যুবক হয়ে মৃত্যুবরণ করে। আল্লাহপাক তার এ আকাঙ্ক্ষাগুলো পূর্ণ করেন। এজন্য তারা সকল কিছু দেখতে পায় কিন্তু তাদের কেউ দেখতে পায় না। তারা মৃত্যুবরণ করলে ভূপৃষ্ঠে অদৃশ্য হয়ে যায়। তাদের কেউ মারা গেলে বৃদ্ধাবস্থায় মারা যায় না বরং তারা যুবক যুবতী হয়ে মারা যায়।

জিনদের প্রকারভেদ

তাফসীরে ফতহুল আজীজে জিন পাঁচ প্রকার বলা হয়েছে। যেমন-

১. মুসলমান জিন– এ জাতীয় জিন নামাজ রোজা, হজ্জ কুরআন তেলাওয়াত ও বিভিন্ন দ্বীনি ইলম শিক্ষা করে থাকে। এদের মধ্যে অনেকে আবার অসভ্য ইতরও হয়ে থাকে।

২. কাফের জিন– এ জাতীয় জিন কাফের (হিন্দু, খ্রিষ্টান,বিধর্মী) তাই এরা মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে তৎপর থাকে। তারা মানুষ কাফের – মুশরিকদেরকে নানা কাজে সাহায্য করে থাকে।

৩. মুনাফিক বা কপট শ্রেণীর জিন– এরা প্রকৃত মুসলমান জিনদের কাছে নিজেদের মুসলমান দাবি করে এবং তাদেরকে দেখিয়ে বিভিন্ন ধর্ম করে কাজও করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে নিফাকী রয়েছে। এরা কাফের – মুশরিক জিনদের সাথে গােপনে আঁতাত করে, মানুষের সর্বনাশ করতে ওপর থাকে।

৪. ফাসিক জিন– এরা কাফের – মুশরিকদের মত মানুষের ক্ষতি করে এবং নানাভাবে কষ্ট দেয়। তারা আবার বিভিন্ন নযর নেওয়ায নিয়ে থাকে।

৫. ইতর জিন- এ শ্রেণীর জিনেরা মানুষকে নানা প্রলােভনে লােভাতুর করে তোলে এবং অন্যায় কাজ করতে উৎসাহী করে তােলে।

৬. কোন কোন কুকুরও জিনদের মধ্যে গণ্য। তবে এরা খুবই দুর্বল শ্রেণীর। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, খানা খাওয়ার সময় কোন কুকুর যদি সম্মুখে বসে থাকে তবে কিছু দিয়ে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিবে। বিশেষ করে কালো কুকুরের ব্যাপারে হুজুর (সাঃ) বলেন, কালো কুকুর নামাজির সম্মুখ দিয়ে চলে গেলে নামাজ নষ্ট হয়ে যায়। মুসলিম শরীফে কালো কুকুরকে শয়তান বলা হয়েছে। এজন্য এ জাতীয় কুকুর হত্যা করা পুণ্যের কাজ।

জিনদের আকৃতি পরিবর্তনের রহস্য

কাজী আবুল ইয়ালা হাম্বলী (রা.) বলেন, জিনেরা তাদের আকৃতি পরিবর্তন করার কোন শক্তি নেই। হ্যাঁ; একথা সত্য যে, আল্লাহ পাক তাদেরকে এমন কিছু শব্দাবলি জানিয়ে দিয়েছেন যেগুলাে ব্যবহার করলে তাদের ইচ্ছা মত আকৃতি ধরতে পারে। তারা যখন কোন প্রাণী বা বস্তুর আকৃতি ধারণ করে তৎসঙ্গে এগুলাের স্বভাব-গুণ ও তাদের মধ্যে চলে আসে। যেমন বাঘের রূপ ধরলে হিংস্রতা, সাপের রূপ ধরলে ছোবল দিয়ে ধ্বংস করার ক্ষমতা এবং ঘোড়ার রূপ ধারণ করলে তীব্র গতিতে দৌড়ের ক্ষমতা চলে আসে।

নিজে নিজে তারা আকৃতি পরিবর্তনের কোন ক্ষমতা নেই। কেননা তাদের নিজেদের আকৃতি থেকে পরিবর্তন করে অন্য রূপ ধারণ করা তাদের মূল উৎসের বিরোধী এবং উপাদান বিরোধী। তাদের মূল অংশ যখন অন্য রূপে পরিবর্তন হয়ে যায় তখন প্রথম আকৃতির জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এতে করে সার্বিক বিষয়ের উপর সংঘটিত বিষয়াদি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ইসলামের আলোকে জিন জাতির ইতিহাস (পর্ব ২)

ইসলামের আলোকে জিন জাতির ইতিহাস (পর্ব ৩)

Share this post on..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *